ইতালির একটি শহর নেপলস। আঠারো শতকের দিকে এই শহরের দরিদ্র মানুষরা তুলনামূলক সস্তা এবং তাড়াতাড়ি তৈরি করে ফেলা যাবে, এমন ধরনের এক প্রকার খাবার তৈরির উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগ থেকেই জন্ম হয় পিৎজার।
আজও ইতালির অন্যান্য শহরের বাসিন্দারা পিৎজাকে গরিবের খাবার বলেই মনে করে থাকেন। এমনকি সেই সময়কার লেখকরা এই খাবারকে ‘জঘন্য’ হিসেবে তাদের লেখায় উপস্থাপন করেছিলেন। ভাগ্যের কী পরিহাস, সেই তথাকথিত জঘন্য খাবারটিই আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত!
গত বছর খননকাজ চলাকালীন পম্পেই নগরীর একটি বাড়ির দেয়ালে ফ্রেসকো আবিষ্কৃত হয়। সেই চিত্রকর্মে দেখা যায়, একটি সিলভারের প্লেটে গোলাকার ফ্ল্যাটব্রেড এবং সেই সঙ্গে তাজা ও শুকনো ফলমূল, যেমন- ডালিম, খেজুর সাজিয়ে রাখা হয়েছে এবং একটি পানপাত্রে রেড ওয়াইন রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ২০০০ বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া এই চিত্রকর্ম আসলে বিখ্যাত ‘ইতালিয়ান পিৎজা’র পূর্বসূরি!
পিৎজা প্রথমে রাস্তার পাশে বিক্রি হতো। এমনই জৌলুসহীন ছিল এই খাবারটি। কিন্তু এই অবহেলিত খাবারটি জনপ্রিয় হলো কীভাবে? ১৮৮৯ সালের কথা। ইতালির রানি মার্গেরিতা তার স্বামী রাজা প্রথম উমবের্তোকে নিয়ে নেপলস শহর পরিদর্শনে আসেন এবং তখন তিনি ভিন্ন স্বাদের কোনো খাবার টেস্ট করতে চাইলে তাকে সাহস করে পিৎজা পরিবেশন করা হয়। রানি মার্গেরিতা পিৎজা খেয়ে তার স্বাদে বিমোহিত হয়ে পড়েন। রানির বদৌলতেই পথের ধারে বিক্রি করা দরিদ্রদের এই খাবারটি পায় রাজকীয় সম্মান!
রানির সম্মানার্থে তার নামেই সেই পিৎজার নামকরণ করা হয় ‘মার্গেরিতা পিৎজা’। কোনো কোনো স্থানে এটি ‘মার্গারিটা পিৎজা’ নামেও পরিচিত। সময়ের পরিক্রমায় পিৎজার এখন অনেক রকমফের হলেও সেদিন মার্গেরিতা পিৎজায় টপিংস হিসেবে দেওয়া হয়েছিল শুধু সফট হোয়াইট চিজ, টমেটো এবং পুদিনা পাতা। ইতালির পতাকার রঙের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে সাদা, সবুজ ও লাল রঙের উপাদানে সজ্জিত টপিংস দেওয়া পিৎজাটিকে রানি তার ‘প্রিয় আইটেম’ বলে আখ্যা দেন এবং হঠাৎ করেই এটি নেপলস শহরে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রানি মার্গেরিতার জন্য পিৎজা আলাদা সম্মান পেলেও ইতালীয়দের দ্বারা তা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায়নি, পেয়েছিল আমেরিকানদের দ্বারা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নেপলসের মানুষরা যখন কাজের সন্ধানে আমেরিকায় পাড়ি জমান, তখন তাদের মাধ্যমে এই খাবারটি সেখানে জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
সর্বপ্রথম ইতালিয়ান পিৎজেরিয়া ‘দ্য পিয়েত্রো’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮০ সালে নেপলসে। আউটলেটটি পরে ‘পিৎজেরিয়া ব্রান্দি’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং এই আউটলেটের মালিক রাফায়েল এসপোজিতোই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি রানি মার্গারিটার নেপলস সফরের সময় তাকে পিৎজা বানিয়ে খাইয়েছিলেন। অন্যদিকে নিউইয়র্কের পিৎজা আউটলেট লোম্বারদি’স চালু হয় ১৯০৫ সালে। ১৯৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ ইতালিয়ান অধ্যুষিত এলাকাতেই পিৎজেরিয়া গড়ে ওঠে এবং একই সঙ্গে তৈরি হতে থাকে বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি পিৎজা।
যে সময় পিৎজা দূরদেশে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছিল- সেই সময়, ভাবা যায় তখন ১৯১৮ সাল অবধি ইতালির কোনো পত্রপত্রিকায় এই খাবারটিকে নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। ইতালির অন্য রাজ্যের মানুষরা তখন অবধি পিৎজা নামক খাবারটির সঙ্গে ঠিকঠাকভাবে পরিচিতই হয়নি। পরবর্তী সময়ে পরিচিত হলেও এ খাবারটিকে অন্য রাজ্যের মানুষরা আপন করে নিতে পারেনি।
১৯৩০ সালের পর পিৎজা টেকঅ্যাওয়ের জন্য বিশেষ কার্ডবোর্ডের বাক্স ব্যবহার করা শুরু হলো এবং ষাটের দশকের শেষভাগে ফ্রোজেন পিৎজা ব্যবস্থাও জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তোতিনো’স এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রোজেন পিৎজা ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড, যা রোজ এবং জিম তোতিনো মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
লন্ডনে ১৯৩৪ সাল থেকে পিৎজার প্রচলন শুরু হলেও পিটার বোয়জো ১৯৬৫ সালে ওয়েস্ট লন্ডনের ওয়াডু স্ট্রিটে চালু করেন জনপ্রিয় পিৎজা ব্র্যান্ড ‘পিৎজা এক্সপ্রেস’-এর প্রথম আউটলেট। তিনি নেপলস থেকে একটি পিৎজা ওভেন আমদানি করেন এবং ওয়াডুর স্ট্রিটে দুই শিলিংয়ের বিনিময়ে এক স্লাইস পিৎজা বিক্রি করতেন।
অন্য জনপ্রিয় পিৎজা ব্র্যান্ড ‘পিৎজা হাট’ ১৯৭৩ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় নর্থ লন্ডনে এবং ডমিনো’জ-এর প্রথম আউটলেট চালু হয় ১৯৮৫ সালে লন্ডনের আরেক শহর লুটনে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও রয়েছে ডমিনো’জ, পিৎজা হাটের মতো বিখ্যাত পিৎজা ব্র্যান্ডের শাখা। এসব আউটলেটে ক্ল্যাসিক মার্গেরিতা, পিৎজা মার্গেরিতা, বারবিকিউ পিৎজা, পিৎজা ডায়াভোলা, ফোর সিজনস পিৎজাসহ বিভিন্ন ধরনের পিৎজা পাওয়া যায়।
তারেক
.jpg)
.jpg)