গভীর রাত। পাশের রুম থেকে এখনো হইচই ভেসে আসছে। মেসবাড়ির দৃশ্য যেরকম হওয়ার কথা তেমনটাই লক্ষ্য করছে শাহেদ। চারতলা বিল্ডিংয়ের নিচ তলা কমিউনিটি সেন্টার। দোতলায় মালিক থাকেন। তৃতীয় আর চতুর্থ তলায় মেস বাসা ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে।
মালিক ভদ্রলোক, সরকারি চাকুরে। তাই নিদেন প্রয়োজন না পড়লে তিনি এ বাড়িতে একদমই আসেন না। তার স্ত্রী লতা ভাবী অত্যন্ত সুন্দরী এবং মিষ্টিভাষী। এলাকায় তার বাবার ব্যাপক নামডাক আছে। চাকুরে ভদ্রলোক গ্রামের অধিবাসী। দেখতে শুনতে অনেক স্মার্ট এবং সুদর্শন বলা চলে। তার ওপরে তিনি আবার একটি সরকারি ব্যাংকের ডিজিএম।
মূলত মেসবাড়ির তৃতীয় তলায় থাকেন ব্যাচেলর কর্মজীবী ও নানা পেশার লোকজন। একেকটা রুমে তিনজন করে থাকতে পারে। পাকা বাড়ি। তাই ভাড়াটা একটু বেশি। ভালো মাইনে না পেলে এ বাড়িতে কেউ থাকার তেমন সাহস করেন না। দক্ষিণ দিকের রুমে থাকেন বেসরকারি একটি ব্যাংকের দু’জন অফিসার এবং একজন ব্যবসায়ী। নাজমুল হোসেন হলেন বেসরকারী ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার। অন্যজন হলেন ক্যাশিয়ার।
নাজমুল হোসেনের একটা ব্যতিক্রমী অভ্যাস আছে। মেসবাড়িতে যে নতুন উঠেন, তার রুমে যাবেন। ভাইসব কোন গ্রাম থেকে এসেছেন- বলে তার সঙ্গে একটু বসবেন। কিছুক্ষণ ভাব জমাবেন। তারপর তারই রুমের সোলায়মানকে বলবেন- সোলায়মান এখানে তিন কাপ চা নিয়ে আসো। অনেক আলাপ-চারিতা চালিয়ে যাবেন। তার পরই শুরু হবে তার আসল ঘটনাটি বলা। আগন্তুককে জিঞ্জাসা করবেন, তা ভাই সাহেবে বেতন কেমন? আচমকা কাউকে এ কথা জিজ্ঞেস করাতে লোকটা কিছুক্ষণ হচকচিয়ে আমতা আমতা করে বলবেন বাইশ হাজার। এটা শোনার পর তিনি সহাস্য বদনে বলবেন- ভাই আমার বেতন ১ লক্ষ চার হাজার টাকা। এ গৌরবের কথাটি বলেই তিনি বের হয়ে আসবেন। এভাবেই চলছে তার দেমাগি চাকরিজীবনের ইতিবৃত্ত জাহির করার কূটকৌশল। তবে এবার যে নামজুল সাহেব নাস্তানাবুদ হবেন এমনটা তিনি কল্পনাতেও ভাবতে পারেননি।
মেসবাড়িতে শাহেদ চৌধুরী নামের একজন নতুন সদস্য উঠেছেন। বাড়ী বিক্রমপুর। তিনি বড় মাপের ঠিকাদার। এবারও নাজমুল সাহেব তার সহকারী নিয়ে হাজির হলেন তার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে। গিয়েই প্রথমে তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। তার পরিচয় দিলেন। তার হোম ডিস্ট্রিক্ট বরিশাল তাও বললেন। অনেকক্ষণ পর কথা শেষে জিজ্ঞেস করলেন- ভাই সাহেব তা আপনার মাসিক ইনকাম কী রকম? হঠাৎ এমন কথা শুনে শাহেদ চৌধুরী অপ্রস্তুত হলেন। নিজেকে সামলিয়ে বললেন, তা আপনারটা আগে বলুন নাজমুল সাহেব। আপনার মাসিক স্যালারি কত? নাজমুল সাহেব বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে খিলখিল করে হেসে উত্তর দিলেন আর বলবেন না ভাই সাহেব। বেতন একটু বেশিই পাই। তারপরও পোষায় না। আমার মাসিক স্যালারি ১ লক্ষ ৪ হাজার টাকা। এ কথা শুনে শাহেদ চৌধুরী বলল, তা এ সামান্য বেতন নিয়ে চলেন কি করে। আমি তো রোজ ইনকাম করি লাখ টাকার ওপরে। এমন কথা নাজমুল সাহেবকে শুনতে হবে তা তিনি ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারেননি। লাখ টাকার ওপরে বেতন পান তা নাকি সামান্য। আর এ ভদ্রলোক লাখ টাকা ইনকাম করেন রোজ। অপমানে নাজমুল সাহেবের মুখটা একেবারে ছোট হয়ে গেল। তিনি তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারলেন না। এবার তার উচিত শিক্ষা হয়েছে। তিনি আর নিজের বেতন নিয়ে গরিমা দেখাতে যাবেন না।
এ মেসবাড়িতে তিনজন কাজের খালা আছেন। তিন ফ্ল্যাটের তিনজন- অন্তরের মা, রাহেলা খালা ও সহেলী খালা। তবে সন্ধ্যার পর পরই আজকে গন্ডগোল শুরু হয়েছে মেসবাড়ি জুড়ে। সেখানে বাড়ীর মালিকের ৫ হাজার টাকা খোয়া গেছে। অন্তুর মা বাড়ির মালিকের ঘরে ধোয়ামোছার কাজ করেন। তাই সন্দেহটা তাকে ঘিরেই। ব্যাংকের ডিজিএম সাহেব ঘটনাটি শুনে অন্তুর মাকে ডেকে টাকা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলেন। কিন্তু তিনি ‘না’ উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই ডিজিএম সাহেব অন্তুর মায়ের গালে কষে দু’টো চড় বসালেন। চড় খেয়েই অন্তুর মা মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিচে নামছেন। শাহেদ চৌধুরীকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলেন অন্তুর মা- ‘মামা আমাকে কি কখনো কারো টাকা ধরতে দেখেছেন’। তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। তার পর পুরো ঘটনাটি শুনলেন অন্তুর মার কাছ থেকে। ঘটনাচক্রে টাকাটা পেয়েছেন শাহেদ চৌধুরী। টাকা পাওয়ার পর তিনি তক্কে তক্কে ছিলেন কেউ টাকার দাবি করেন কি না। কিন্তু না, কেউ বলছে না যে টাকা হারিয়েছে। পরে অবশ্য শাহেদ চৌধুরী টাকাটা ডিজিএমএ এর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে অন্তুর মা চড়টা খেয়েছেন। কারণ টাকা পেয়েছেন শাহেদ চোধুরী। এভাবেই অন্তুর মা কাজের বুয়া হয়ে মানুষের চড় থাপ্পর খেয়ে জীবন যাপন করছেন।
শাহেদ চৌধুরী ময়মনসিংহ ছেড়ে চলে আসার কয়েকদিন পরেই ঘটে গেল মর্মান্তিক এবং ভয়াবহ ঘটনা। ময়মনসিংহ শহরে রিলিফের কাপড় আনতে গিয়ে সতেরজন গরীব মানুষের করুণ মৃত্যুর ঘটনায় তার মধ্যে অন্তুর মাও আছেন। এ ঘটনা শোনার অনেকক্ষণ পর্যন্ত শাহেদ চোধুরী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। অভাবী এবং গরীবরা যেন এভাবেই মরার জন্য সৃষ্টি হয়েছে!
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক
.jpg)
.jpg)