উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে নদী পাড়ের হাজার হাজার কৃষকের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ফসলের জমির ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
লালমনিরহাটের প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় তিস্তা নদীর বাম তীরের অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল এলাকায় রোপা আমন, আগাম শীতের শাকসবজি, চীনাবাদাম, মাষকলাই, আখ ইত্যাদি ফসল পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। পানি নেমে যাওয়ার পর প্লাবিত এসব ফসলের ওপর কাদামাটি জমে যাওয়ায় অনেক ফসল পচে যেতে শুরু করেছে। কৃষকরা ফসলের কাদামাটি ধুয়ে ফেলতে চেষ্টা করছেন। তবে এতে খুব বেশি সফল হওয়া যাচ্ছে না। অনেক স্থানে ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ফসলিখেত।
জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বাহাদুরপাড়া, গরিবুল্লাপাড়া, কালমাটি, হরিণ চড়া, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, তাজপুর ও হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সিংগীমারী, সিন্দুনা ডাউয়াবাড়ি, পাটিকাপাড়া এবং পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি।
লালমনিরহাটের অধিকাংশ মানুষ কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। নদী এলাকা ছাড়াও উজানের বিভিন্ন স্থানে ভারী বর্ষণের ফলে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে জেলার ভেলাবাড়ি, কমালাবাড়ি, মুঘলঘাট, চাপারহাট এসব এলাকায় ব্যাপক সবজির আবাদ হয়। ভারী বৃষ্টির কারণে আগাম শীতের সবজিখেতের ক্ষতি হয়েছে, ফলে নতুন করে সবজি উৎপাদনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে কৃষকদের। এ ছাড়াও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ধানখেতের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লালমনিরহাটের কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার পাঁচ উপজেলায় ৯০ হাজার ২২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮১ হেক্টর অর্থাৎ ৬৩ দশমিক ৭ হেক্টর আবাদি ফসল নষ্ট হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এতে ১১০৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, এবারের রবি মৌসুমের জন্য পাঁচ উপজেলায় ১৯ হাজার ১০০ কৃষককে ৬টি ফসলের প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে গম, ভুট্টা, চীনাবাদাম, পেঁয়াজ ও সরিষা।
হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনি গ্রামের কৃষক খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা নদীর পার্শ্ববর্তী জমিতে আমন ধান রোপণ করেছিলাম। বন্যায় জমিতে বালুর স্তূপ পড়ে ঢেকে গেছে। অনেক জমি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে।’
আদিতমারী এলাকার গোবর্ধন গ্রামের শরিফুল ইসলাম জানান, ‘নদীর পানি ঘোলা থাকায় ধানগাছের ডগায় মাটির স্তূপ জমেছে। বন্যার পানি দিয়েই কিছুটা ধুয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে তাতেও ধান চিটা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়ে ছিলাম। বন্যায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে সংসার চালাব, এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বলেন, রবি মৌসুম ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলে। এ বছর লালমনিরহাটে ৬ হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে শাকসবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৩৯৩ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের শাকসবজি চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ হেক্টর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে প্রায় ২৭ হেক্টর ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘চলমান বন্যায় আমনখেতসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করব।’