ঠাকুরগাঁওয়ে শুরু হয়েছে শীতের খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। প্রতিদিন গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তা থেকে সুস্বাদু গুড় তৈরি করছেন। গুড়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দামও বেড়েছে। তবে গাছ ভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে গাছিরা কিছুটা অসুবিধায় পড়েছেন। স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদনের জন্য সরকারি নির্দেশনা মেনে গুড় তৈরির কাজ চলছে। খেজুরের গুড় স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গুড় তৈরির প্রক্রিয়া
প্রতিদিন ভোরবেলা গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য মাঠে যান। গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দিয়ে রাত্রিকালেই রস সংগ্রহ শুরু হয়। এই রস সারারাত ধরে গাছ থেকে পড়তে থাকে এবং ভোরে তা হাঁড়িতে জমা হয়। রস সংগ্রহ শেষে শুরু হয় গুড় তৈরির কাজ।
গাছিরা প্রথমে সংগ্রহ করা রস বড় হাঁড়িতে জড়ো করেন এবং সেটি ছেঁকে পরিষ্কার করে চুলায় বসানো হয়। এর পর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রসটি জ্বাল দেওয়া হয়। রসটি ঘন হতে থাকে এবং গুড়ের আকার নিতে শুরু করে। রস গরম অবস্থায় ছোট খাঁচায় ঢেলে দেওয়া হয়। খাঁচার ভেতর ঠান্ডা হয়ে সেটি শক্ত হয়ে সুস্বাদু খেজুর গুড়ে পরিণত হয়।
গুড়ের স্বাদ ও স্থানীয় জনপ্রিয়তা
ঠাকুরগাঁওয়ের খেজুর গুড়ের স্বাদ স্থানীয়ভাবে খুবই জনপ্রিয়। স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমবার খেজুর গুড় তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে এসেছি। এখানকার গুড়ের স্বাদ অসাধারণ। পরিবার নিয়ে গুড় কিনতে এসেছি।’ দর্শনার্থী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘এখানে সরাসরি গুড় তৈরি হতে দেখে কিনতে আলাদা আনন্দ লাগে। পরিবারের জন্য ৫ কেজি গুড় নিয়ে যাচ্ছি।’
গাছিরা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া
এ বছর ঠাকুরগাঁওয়ের নারগুণ ইউনিয়নের বোচাপুকুর গ্রামে খেজুরগাছের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রাজশাহী থেকে কিছু গাছি খেজুরগাছ ভাড়া নিয়ে গুড় উৎপাদনের কাজে জড়িত হয়েছেন। গাছিরা জানান, গাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় গাছ ভাড়া দেওয়ার খরচ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। গাছি আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গুড় তৈরি করছি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কেজি গুড় উৎপাদন করছি।’ তবে তিনি এও জানান, গাছ ভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতি কেজি গুড়ের দাম ৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পাইকারিতে গুড়ের দাম ২৫০ টাকা এবং খুচরায় ৩০০ টাকা।
গাছি আমিনুল ইসলাম জানান, গাছ ভাড়া বেড়েছে। তাই লাভের পরিমাণ কিছুটা কম হয়েছে। তবে শীতের রস ও গুড়ের চাহিদা ভালো থাকায় কিছুটা আয় বাড়লেও তার মতে, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সরকারি নির্দেশনা
তবে ঠাকুরগাঁও জেলা সিভিল সার্জন ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ জানিয়েছেন, কাঁচা খেজুরের রস পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘কাঁচা রস থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। তাই গাছিদের স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং গাছে নেট ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে, যাতে গুড় তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না হয়।
অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ঠাকুরগাঁওয়ের খেজুর গুড় শুধু একটি খাদ্য উপকরণ নয়, এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, ‘শীত মৌসুমে খেজুরের গুড় আমাদের অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। তবে আধুনিক পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে গাছিরা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।’
গাছিরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঠাকুরগাঁওয়ের গুড় উৎপাদন দেশের চাহিদা মেটাতে আরও ভালো ভূমিকা পালন করতে পারবে। দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারসাপেক্ষে এই শিল্পটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।