কিশোরগঞ্জের হাওরের কৃষকরা বছরের সাত মাস পরবাসী জীবন কাটিয়ে সোনালি ফসল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তাদের কষ্টের মাধ্যমে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই কৃষকদের ‘জিরাতি’ বলা হয়। তারা হাওরাঞ্চলগুলোতে বসবাস করেন। ফসল উৎপাদনের জন্য বছরের একটি বড় সময় নিজের পরিবার ও পরিচিতজনদের ছেড়ে অস্থায়ীভাবে হাওরে থাকেন।
কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম উপজেলার জিরাতিরা বোরো ধান উৎপাদনসহ নানা ধরনের কৃষিকাজ করেন। তারা হাওরে ধানের পাশাপশি ভুট্টা, সরিষা, বাদাম, মিষ্টিআলু, মাষকলাই, চিনাবাদাম, মরিচ, গমসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করেন। এই মৌসুমে জমি তৈরি, বীজতলা প্রস্তুতি, চারা রোপণ, সেচ, পরিচর্যা ও ধান কাটাসহ মাড়াই-ঝাড়াইয়ের ব্যস্ত সময় পার করেন তারা।
হাওরের কৃষকরা দীর্ঘ সময় নিজ বাড়ি ছেড়ে বাঁশের বেড়া ও ছনের ঘর বানিয়ে হাওরে বসবাস শুরু করেন। তাদের এই পরবাসী জীবন শুরু হয় কার্তিক মাস থেকে। যখন হাওরের পানি কমে যায়, তখন জমি প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময় বোরো ধানের চারা রোপণ এবং ফসলের যাবতীয় কাজ চলতে থাকে। বছরের এই সাত মাস ধরে কৃষকরা পরিশ্রম করে নিজের খাবারের ব্যবস্থা হিসেবে মাছ ধরেন, গরু-ছাগল পালন করেন, হাঁস-মুরগি লালন-পালন করেন ও সবজি চাষ করেন।
জিরাতিদের জীবন বড় কঠিন। হাওরের উঁচু-নিচু জমিতে কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। এর মধ্যে তাদের বড় সমস্যা খাবারের পানি ও শৌচাগারের অভাব। এভাবে জিরাতিরা নানা সংকট কাটিয়ে ফসল ঘরে তোলেন।
ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি ইউনিয়নের বড় হাওরের কৃষক হিমেল বলেন, ‘প্রতিবছর আমাকে এখানে এসে ফসল চাষ করতে হয়। পৌষ মাসে জমিতে ধানের চারা রোপণ করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আমাদের বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হয়।’
মিঠামইন হাওরের কৃষক মারফত আলী ও তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের কাজলা গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘হাওরে বিশুদ্ধ পানির অভাব খুবই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি আমাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করত, তবে আমাদের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হতো।’
এ বছর বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হবে। এর মধ্যে ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৯১২ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব ফসল উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন এই জিরাতিরা।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হাওরের ফসল উৎপাদনে জিরাতিদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, পাশের নেত্রকোনা, জামালপুর থেকেও হাওরাঞ্চলে এসে কাজ করেন। তারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিশাল অবদান রাখেন। কিন্তু তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাচ্ছেন না।’
স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘হাওরের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য সরকারিভাবে বিশুদ্ধ পানির টিউবওয়েল স্থাপন করা হলেও অস্থায়ী বাসিন্দা জিরাতিদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।’
স্থানীরা জানান, হাওরের কৃষকরা দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের জীবনযাত্রা অনেক কষ্টকর। তাদের জন্য সরকারিভাবে আরও সুবিধা দেওয়া উচিত। এ ছাড়া বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও কৃষকদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য হাওরাঞ্চলের জিরাতিদের জীবনযাত্রার উন্নতি করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।