রাজশাহীতে পানের দাম কমে গেছে। টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, রোগবালাই এবং বাজারে পাইকারের সংকটে বিপাকে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক বেশি পানচাষি। অনেকেই বরজ তুলে ফেলছেন। বাজারে পাইকার নেই। খরচ উঠছে না। পান পুকুরে ফেলতে হচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে রপ্তানি। ব্যাপারীদের সিন্ডিকেট রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। না হলে পানের চাষ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী রাজশাহীতে বর্তমানে ৫ হাজার ২৮৮ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। ২০১৮ সালে এই পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৯৮ হেক্টর। গত সাত বছরে জমি বেড়েছে ২ হাজার ৬৯০ হেক্টর। জেলায় বর্তমানে ৪৪ হাজার ৮৭৬টি পানের বরজ রয়েছে, যেখান থেকে বছরে ৮০ হাজার ৪৫৬ টন পান উৎপাদিত হয়। মিঠা পানের বাজারমূল্য বছরে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। চাষির সংখ্যা ৫৫ হাজার ৭৮০ জন। পান চাষের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ।
চাষিরা জানাচ্ছেন, জানুয়ারিতে প্রতি ‘বিড়া’ (৬৪টি পান) বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। এখন তা নেমে এসেছে ২০-৩০ টাকায়। সাধারণ মানের পান ১০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে পরিবহন খরচও ওঠে না। অনেক পান ফেলে দিতে হচ্ছে।
মোহনপুরের একদিলতলা গ্রামের কৃষক মাহাতাব আলী বলেন, ‘দেড় লাখ টাকা খরচ করে বরজ করেছি, এখন উৎপাদন খরচও উঠছে না। গাছ বাঁচাতে অতিরিক্ত কীটনাশক দিতে হচ্ছে। তাই বরজ তুলে অন্য ফসল করার চিন্তা করছি।’ দুর্গাপুরের পানচাষি আকবর আলী বলেন, ‘এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পান চাষ করেছি। কিন্তু এখনো ৩০ হাজার টাকার পানও বিক্রি হয়নি। ঋণ শোধ নিয়েই চিন্তায় আছি।’ বাগমারার আলোকনগরের কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে রাজশাহীর মিঠা পান রপ্তানি হতো। এখন নানা জটিলতায় রপ্তানি বন্ধ। খিলি পানের দাম বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু মোকামে পানের দাম পড়ে গেছে। ব্যাপারীদের সিন্ডিকেটে আমরা চাষিরা মার খাচ্ছি।’
জানা গেছে, রাজশাহীর দুর্গাপুর, পবা, মোহনপুর ও বাগমারায় শতবর্ষ ধরে পান চাষ হয়ে আসছে। এসব এলাকায় পান বেচাকেনার জন্য ২০টি হাট ও ৪টি বড় মোকাম রয়েছে। এর মধ্যে মোহনপুরের মৌগাছি অন্যতম বড় মোকাম। এ ছাড়া বাগমারার তাহেরপুর-মোহনগঞ্জ, মোহনপুরের কেশরহাট এবং দুর্গাপুরের আলীপুর-দাউকান্দি মোকাম থেকে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার পান বিক্রি হতো। কিন্তু এবার সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে।
মোহনগঞ্জ মোকামের চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পাইকার আসেন না। গত এক মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি করেছি। বাকিগুলো ফেলে দিতে হয়েছে।’ মৌগাছির পান ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত দেড়-দুই বছরে পানের দাম বাড়েনি, কিন্তু জর্দা, সুপারি ও মসলার ওপর কর বাড়ায় দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এতে ভোক্তা কমেছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি কমে যাওয়ায় চাহিদাও কমেছে।’
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা টিপু সুলতান বলেন, ‘পান দীর্ঘমেয়াদি ফসল। একটি বরজ ২০ থেকে ৩০ বছর ফলন দেয়। তবে নিয়মিত বরজ সংস্কার করতে হয়। এ বছর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বছরের এই সময়ে দাম কিছুটা কম থাকে। তবে দুই মাস পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যায়।’
একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। ফলে রাজশাহীর পানচাষিরা এখন নিদারুণ সংকটে। এই ‘সবুজ সোনা’ আবার চাষির মুখে হাসি ফোটাবে কি না, তা নির্ভর করছে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।