দিনাজপুরে কৃষি খামারি অ্যাপের ব্যবহার দিন দিন বাড়ায় কৃষি আবাদে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চাষাবাদ সহজ হওয়ায় কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণরা। অনেকেই কৃষিকে এখন আধুনিক ও লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে ফসলের ফলন ও গুণগত মান।
সদরের বড়াইল বনকালি এলাকায় শিক্ষিত যুবকদের সমবায় উদ্যোগে কৃষি খামারি অ্যাপ ব্যবহার করে আলু চাষ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কৃষি বিভাগের উদ্ভাবিত এই অ্যাপ ব্যবহার করে তারা ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ বা উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করছেন। অ্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ, উন্নত বীজ ব্যবহার, সীমিত কীটনাশক ও জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করায় তারা স্বাবলম্বিতার পথে এগোচ্ছেন।
কৃষকরা জানান, অ্যাপের মাধ্যমে জমিতে কখন কতটুকু সার দিতে হবে, কীটনাশক প্রয়োজন আছে কি না, কখন সেচ দিতে হবে–সবকিছুই নির্ধারিত থাকে। ফলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশ ও জমির উর্বরতা রক্ষা পাচ্ছে।
অ্যাপ ব্যবহারকারী তরুণ কৃষক বসন্ত রায় বলেন, ‘কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে আমি স্মার্টফোনে কৃষি খামারি অ্যাপ ডাউনলোড করি।’ তিনি জানান, অ্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও জৈব সার ব্যবহার করে তিনি ৩৩ শতক জমিতে আলু চাষ করেছেন। এতে গত বছরের তুলনায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ কম হয়েছে। গাছের বৃদ্ধি ও জমির অবস্থা দেখে তিনি আশাবাদী, এবার ফলন আগের চেয়ে ভালো হবে।
একই এলাকার চাষি রাখাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের এলাকার ১৫ যুবক একত্রিত হয়ে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে সমবায় ভিত্তিতে আলু চাষ করছি।’ তিনি জানান, সবাই একই সময়ে আলু রোপণ করেছেন এবং অ্যাপ অনুযায়ী সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। আলুর বয়স এখন প্রায় ৪৫ দিন। আরও ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে আলু উত্তোলন করা যাবে। খেতের অবস্থা দেখে তারা ভালো ফলনের আশা করছেন।
তরুণ কৃষক দীপু রায় বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা কৃষিকাজ করলেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জানতেন না।’ তিনি জানান, স্মার্টফোনে কৃষি অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি তার বাবাকে জমিতে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগের পরামর্শ দেন। এতে উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং ফলন বাড়ছে। তার হিসাবে, বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার চেহেল গাজী ইউনিয়নের ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেশবন্ধু মহন্ত বলেন, ‘এলাকার অধিকাংশ চাষি শিক্ষিত এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হওয়ায় কৃষি খামারি অ্যাপ দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।’
তিনি জানান, বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে অ্যাপ ব্যবহার করে আলু চাষ হচ্ছে। এতে রোগবালাই কমেছে, জমির উর্বরতা বেড়েছে এবং চাষিরা জৈব সার ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন।
সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তুষার বলেন, ‘চলতি মৌসুমে সদর উপজেলায় প্রায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে কৃষি অ্যাপ ব্যবহার করে আলু চাষ হয়েছে।’
তিনি জানান, এতে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকার রাসায়নিক সার কম ব্যবহার হয়েছে এবং সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সুষম সার ব্যবহারের ফলে কীটনাশকের প্রয়োজন কমছে এবং ফলন বাড়ছে।
কৃষিজমির আলুর খেত পরিদর্শনে এসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘সরকার কৃষি খামারি অ্যাপ উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক করতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘চাষিরা এই অ্যাপ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ কমবে, জমির উর্বরতা বাড়বে এবং অধিক ফলন নিশ্চিত হবে।’