উর্বর পলিমাটি ও সবুজ শস্যের ঘ্রাণ ছাপিয়ে মানিকগঞ্জের বাতাসে এখন তামাকের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। যে মাটিতে একসময় সোনালি ধান, পাট, আখ ও শস্যের সমারোহ ছিল, সেখানে তামাক কোম্পানির নীলনকশায় এই বিষবৃক্ষ চাষের বিস্তার ঘটছে। সাটুরিয়া, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলাগুলোর বিস্তীর্ণ ফসলি জমির প্রায় ৩৫৫ হেক্টর এখন তামাকের দখলে। এটি চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির উর্বরতাকে যেমন ধ্বংস করছে, তেমনি জীবননাশী ফসলটির সংস্পর্শে এসে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। হাত-পা জ্বালাপোড়া, বমি ভাব থেকে শুরু করে শ্বাসনালির জটিলতা ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির আশঙ্কা তীব্রভাবে বাড়ছে তাদের। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের এই চরম ঝুঁকি উত্তরণে কঠোর নীতিমালা ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পরিকল্পনা এখনই দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, জেলাটির কয়েক হাজার মানুষ এখন তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত। তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া অগ্রিম ঋণ, বিনামূল্যে বীজ-সার আর নিশ্চিত বাজারজাতকরণের প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা জেনে-শুনেই এই আত্মঘাতী পথে পা বাড়াচ্ছেন।
সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ উথলী গ্রামের কৃষক মো. কালাম। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি তামাক চাষ করছেন। এ বছর ১২ বিঘা জমিতে তামাকের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তামাক শরীরের যে জন্য ক্ষতিকর, সেটা আমরা ভালো করেই জানি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তামাকে যে লাভ পাই, অন্য ফসলে তা পাই না। কোম্পানির লোকজন শুরুতেই আমাদের হাতে টাকা তুলে দেন, বীজ-সার দেন। ফসল তোলার পর নির্দিষ্ট দিনে তাদের কাছে নিয়ে গেলে বিক্রির চিন্তা থাকে না। এ জন্য আমাদের বাজার খুঁজতে হয় না। তাই অনেক ঝুঁকি থাকলেও এই চাষ ছাড়তে পারছি না।’
তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। সাটুরিয়া উপজেলার শ্রমিক রাশেদ মিয়া মৌসুমি ভিত্তিতে তামাক খেতে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তামাকপাতা গাছ থেকে ছিঁড়ার কাজ করতে হয়। তারপর সেগুলো বেঁধে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে হয়। বেশির ভাগ সময় হাত-পা জ্বালা করে, শরীর দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরে। তবুও কাজ করি। কারণ অন্য কাজ নিয়মিত পাওয়া যায় না।’
একইভাবে কাজ করা স্থানীয় নারী শ্রমিক মুনতাজ বেগম বলেন, ‘তামাক পাতা তুলতে গেলে শরীরে এক ধরনের আঠালো রস লাগে। এতে অনেক সময় বমি ভাব হয়, অসুস্থ লাগে। কিন্তু সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া উপায় নেই।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, তামাক চাষ শুধু কৃষি জমির ক্ষতি করছে না, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশকর্মী বিমল চন্দ্র রায় বলেন, ‘তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা দ্রুত কমে যায়। ফলে একই জমিতে পরবর্তী সময় অন্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাড়ি, আঙিনা কিংবা রাস্তার পাশে দড়িতে ঝুলিয়ে তামাক শুকানোর সময় এর তীব্র গন্ধ আশপাশের বায়ু দূষিত করে।’
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও উদ্বেগজনক বলে জানান চিকিৎসকরা। মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এ বি এম তৌহিদুজ্জামান সুমন বলেন, ‘তামাক চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষক ও শ্রমিকরা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। তামাকের গ্যাসীয় উপাদান শ্বাসনালির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া তামাক পাতার সংস্পর্শে থাকলে মাথা ঘোরা, বমি ও দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।’
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, তামাক চাষ কমাতে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘তামাকের বিকল্প হিসেবে আখ, কলাসহ উচ্চ ফলনশীল ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের একটি নীতিমালাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আগামী কয়েক বছর তামাকের আবাদ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’