বরিশাল বিভাগে সূর্যমুখী চাষে এ মৌসুমে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আবাদ হওয়ায় বাম্পার ফলনের আশায় রয়েছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। কম খরচে তুলনামূলক বেশি লাভের সুযোগ থাকায় তেলবীজ ফসলটি দ্রুত কৃষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি উন্নত বীজের সংকট, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার ছয় জেলায় সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমি। তবে আবাদ হয়েছে ৯ হাজার ২৬৮ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ দশমিক ৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে পটুয়াখালী জেলায়–৩ হাজার ৫৩৯ হেক্টর। বরগুনায় ৩ হাজার ৩০২ হেক্টর, পিরোজপুরে ৯৮৪, ভোলায় ৯৫০, ঝালকাঠিতে ২৬৫ এবং বরিশাল জেলায় ২৩৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পটুয়াখালীতে প্রায় দ্বিগুণ জমিতে সূর্যমুখী চাষ এ অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কম খরচে অধিক ফলন এবং ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ায় কৃষকরা এ ফসলে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে বারি সূর্যমুখী-৩ ও ডিএস-১ (হাইব্রিড) জাতের ফলন ভালো হওয়ায় এসব জাতের চাষ বাড়ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকার কৃষক বেল্লাল হোসেন বলেন, আগে ধান চাষে খরচ বেশি হলেও লাভ কম ছিল। এবার সূর্যমুখী চাষে খরচ কম, ফলন ভালো হলে লাভ বেশি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
নবগ্রামের কৃষক ইউনুস মোল্লা জানান, ২০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কৃষক খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, প্রথমবার সূর্যমুখী চাষ করে ইতিবাচক ফল পাচ্ছেন। মাঠভরা ফুল দেখে ভালো লাগছে, তেলের দাম ভালো থাকায় লাভের সম্ভাবনাও দেখছেন।
হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়নের কৃষক মো. বাসেদ মোল্লা জানান, কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার পেয়ে তিনি উপকৃত হয়েছেন। প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশ জমিতে চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন এবং আগামীতে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা সূর্যমুখীকে সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি লবণাক্তসহ বিভিন্ন ধরনের জমিতে ভালো ফলন দেয় এবং দেশের ভোজ্যতেলের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের পতিত জমি কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
কৃষি অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মজিবুল হক মিয়ার মতে, সূর্যমুখী চাষ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় তেলবীজ খাত হলেও এর সফলতা নির্ভর করছে সঠিক পরিকল্পনা, বাজারসংযোগ ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর। এটি আমদানি-নির্ভর ভোজ্যতেলের চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং লবণাক্ত জমিসহ অনাবাদি জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাবনার পাশাপাশি উন্নত বীজের সংকট, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তার বিশ্লেষণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ–দুই দিকই উঠে এসেছে। মাটি ও আবহাওয়ার দিক থেকেও সূর্যমুখী বাংলাদেশের জন্য উপযোগী। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা-সহনশীল জমিতে এটি ভালো ফলন দেয়। রবি মৌসুমে পতিত জমি কাজে লাগিয়ে সূর্যমুখী চাষ করলে জমির ব্যবহার বাড়বে এবং কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে উন্নত মানের বীজের সংকট একটি বড় সমস্যা। অনেক কৃষক স্থানীয় বা নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করায় প্রত্যাশিত ফলন পান না। পাশাপাশি আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবও রয়েছে।
তিনি জানান, উৎপাদন বাড়লেও যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে কৃষক এই ফসলের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন। সূর্যমুখী থেকে তেল উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প না থাকাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে সূর্যমুখী চাষ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে এই কর্মকর্তা মনে করেন। বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জমি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বীজ ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে এ ফসল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।