গ্রীষ্মের ধুলোবালি আর তপ্ত রোদকে বিদায় জানিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে আজ সোমবার পা রাখল রূপসী বর্ষা। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। মেঘের গুরুগুরু ডাক আর রিনিঝিনি বৃষ্টির নূপুর নিক্কনে সেজে উঠেছে চারপাশ।
কোথাও টানা বৃষ্টিতে জলজট আর দুর্ভোগের চেনা ছবি, আবার কোথাও পলিবাহিত ঘোলা জলে উর্বর হয়ে উঠছে নদীমাতৃক এই দেশের মাটি, জাগছে নতুন প্রাণ। ধুলোমলিন বৃক্ষরাজি ফিরে পেয়েছে নবজীবন, খাল-বিল আর নদী মেতে উঠেছে নতুন জলের কলতানে।
মেঘে মেঘে আষাঢ় এল: আবহাওয়া বার্তা
আষাঢ়ের প্রথম দিনেই দেশজুড়ে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব থাকবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় রয়েছে। তবে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা জানিয়েছেন, আজ ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ময়মনসিংহে (১০৪ মিলিমিটার) এবং রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৫ মিলিমিটার। আষাঢ়ের আগমনে সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
দুর্ভোগ বনাম স্বস্তি: রাজধানীবাসীর মিশ্র অনুভূতি
যান্ত্রিক শহর ঢাকার বুকে বর্ষা বরাবরই এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়। গতকাল সকালে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ইট-কাঠের নগরে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা নেমে আসে। তবে কর্মব্যস্ত দিনের শুরুতে এই বৃষ্টিই আবার ডেকে এনেছে চিরচেনা দুর্ভোগ। ঢাকার বেশ কিছু নিচু এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে সাময়িক জলজট। কয়দিন ধরে অফিসগামী যাত্রী এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের গণপরিবহনের জন্য বেগ পেতে হয়, গুনতে হয়েছে বাড়তি রিকশা ভাড়া।
তবে শত দুর্ভোগের মাঝেও বর্ষার এই শীতল পরশ স্বস্তি এনেছে রাজধানীবাসীর মনে। কাঠফাটা রোদের পর তপ্ত পিচঢালা পথ শান্ত হয়েছে। জানালার গ্রাস ছুঁয়ে যাওয়া বৃষ্টির ছাঁট আর কদম ফুলের ঘ্রাণে নাগরিক ব্যস্ততার মাঝেও একচিলতে রোমান্টিকতায় মেতেছেন অনেকেই।
সুর আর ছন্দে আষাঢ়কে বরণ: ঢাকায় বর্ষা উৎসব
নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততাকে একপাশে রেখে আজ আষাঢ়ের প্রথম সকাল থেকেই মেঘের এ ঋতুকে বরণ করে নিতে সুর, গান আর নৃত্যের ডালা সাজিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন।
আজ ভোর সাড়ে ৬টায় রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে শুরু হবে উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের বর্ষা উৎসব। ‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক, বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’–এই প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদার উৎসবের উদ্বোধন করবেন। বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে গান, আবৃত্তি ও আলোচনায় মেতে ওঠেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের ভেন্যু পরিবর্তন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি না পেয়ে তারা তাঁবু গেড়েছেন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের দক্ষিণ পাশের চত্বরে। আজ সকাল সাড়ে ৭টায় তরুণ শিল্পী মো. মিনহাজুল হাসান ইমনের কণ্ঠে ‘জয় জয়ন্তী’ রাগের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই উৎসব। জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রতীকী এ দিন শিশু-কিশোরদের মাঝে বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধিগাছের চারাও বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বিচ্যুত অংশের সদস্যরাও বর্ষা উৎসবের আয়োজন করেছে। আজ সকাল সাড়ে ৭টায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে শুরু হবে এ আয়োজন। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খান শাহীর ‘মিয়া কি মল্লার’ রাগের সুর মূর্ছনায় উৎসবের সূচনা হবে। বিশিষ্ট শিল্পী অনিমা রায়, মাহমুদুল হাসান, আব্দুল ওয়াদুদের গান এবং কবি রহমান মুফিজের বর্ষাকথনে মুখরিত হবে এ উৎসব।