একবার ভাবুন, গাড়িতে নেই স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেল। থাকবে না কোনো চালক। গাড়িতে চড়ে বসলেন আর গাড়িটি আপনা-আপনি গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। শুনতে অবাক লাগলেও কল্প-বিজ্ঞানের মতোই এমন বিষয় বাস্তবে ঘটতে চলেছে।
এমন ধারণা বাস্তবে রূপ দিতে অটোনোমাস বা স্বচালিত গাড়ির প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেসলা ‘সাইবারক্যাব’ নামের অত্যাধুনিক রোবোট্যাক্সির প্রোটোটাইপ সবার সামনে এনেছে। এর পাশাপাশি তারা উন্মোচন করেছে রোবোভ্যানের প্রোটোটাইপ। এই গাড়িগুলোর ডিজাইন অনেকের নজর কেড়েছে। তবে এর প্রকৃত কার্যক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।
চলতি মাসের ১০ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিওতে আয়োজিত ‘উই, রোবট’ নামে অনুষ্ঠানে এই প্রোটোটাইপগুলো সবার সামনে হাজির করা হয়। এই রোবোট্যাক্সি ও রোবোভ্যান দেখতে এতটাই আধুনিক যে, এটি দেখে কল্প-বিজ্ঞান মনে হবে।টেসলার এই নতুন গাড়িতে নেই স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেল, এমনকি পেছনের জানালাও। সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক এই রোবোট্যাক্সির দাম হতে পারে ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের নিচে। প্রতি মাইল চলতে খরচ হতে পারে মাত্র ২০ সেন্ট।
ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এই রোবোট্যাক্সি রাস্তায় দেখা যাবে। এটি হবে টেসলার তৈরি করা প্রথম গাড়ি, যা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে। এর আধুনিক ডিজাইন ও নতুন প্রযুক্তি এটা একেবারে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এই রোবোট্যাক্সির দুই দরজা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা প্রজাপতির পাখার মতো ওপর দিকে খুলে যায়। গাড়ির ভেতরে দুজন যাত্রীর বসার জন্য যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। তবে গাড়ির পেছনের অংশে রয়েছে বড় ট্রাংক। শুধু দুটি কাপহোল্ডার ও একটি বড় স্ক্রিন ছাড়া গাড়ির ভেতরে কিছু নেই বললেই চলে, যা টেসলার অন্য মডেলগুলোর মতো।
এ রোবোট্যাক্সির ফিচারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বিদ্যুৎ চার্জিং পদ্ধতি। এতে কোনো চার্জিং পোর্ট নেই। বরং গাড়িটি একটি ইন্ডাকটিভ চার্জিং স্টেশনের ওপর দিয়ে চলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হবে। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এই গাড়িতে চড়ে যাত্রীকে কিছুই করতে হবে না। শুধু আরাম করে বসে যাত্রা করবে।
ইলন মাস্ক বলেন, টেসলার চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি একটি আরামদায়ক ছোট লাউঞ্জের মতো হবে, যা প্রচলিত গাড়ির চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যা খুশি করতে পারবেন এই আরামদায়ক লাউঞ্জে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর শুধু গাড়ি থেকে বের হবেন।’ ভবিষ্যতে এই রোবোট্যাক্সি রাইড-শেয়ারিং সেবার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যেমনটা উবার করে থাকে।
রোবোট্যাক্সির মালিকরা নিজেদের গাড়ি অন্যদের যাতায়াতের জন্য ভাড়া দিতে পারবেন। যখন তারা নিজেরা তা ব্যবহার করবেন না। যেমন রাতের বেলায় আপনার ঘুমানোর সময়, গাড়ি অন্য যাত্রীদের নিয়ে ভাড়ায় চলতে পারবে। এতে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
মাস্কের মতে, ‘অধিকাংশ সময়ই গাড়ি অলস সময় পার করে। তবে যদি এগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়, তাহলে পাঁচ থেকে দশগুণ বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে এসব গাড়ি।’
মাস্ক আরও দাবি করেন, ভবিষ্যতে কেউ পুরো রোবোট্যাক্সির বহর কিনতে পারবেন। তিনি একে ঠিক সেইভাবে দেখভাল করবেন, যেমন একজন রাখাল তার গবাদিপশুদের দেখে রাখে।
এই বিশেষ ইভেন্টে আইজ্যাক আসিমভের উপন্যাস ‘আই, রোবট’-এর প্রতি ইঙ্গিত করে যা ‘উই, রোবট’ নামে পরিচিত। এই আয়োজনে টেসলা আরেকটি স্বয়ংক্রিয় বাস উন্মোচন করেছে, যার নাম রোবোভ্যান।
রোবোভ্যানের ডিজাইনেও কোনো অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। তবে এতে ২০ জন যাত্রীর বসার জায়গা রয়েছে। মাস্ক জানিয়েছেন, এই রোবোভ্যান শহরের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি একটি স্পোর্টস টিমকে কোথাও নিয়ে যেতে চান অথবা যাতায়াতের খরচ মাইল প্রতি ৫ থেকে ১০ সেন্টে নামিয়ে আনতে চান, তাহলে রোবোভ্যান ব্যবহার করতে পারবেন।’ রোবোভ্যানের বহিরের রয়েছে কালো ও সোনালি রঙের আকর্ষণীয় ডিজাইন, যা টেসলার সাইবার ট্রাকের ডিজাইন থেকে অনুপ্রেরিত।
ইলন মাস্কের মতে, টেসলার নতুন রোবোট্যাক্সি ও এ রকম অন্যান্য প্রযুক্তি ভবিষ্যতে রাস্তার রূপ বদলে দেবে। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎকে ভবিষ্যতের মতোই দেখতে হবে।’
টেসলা তাদের এই আয়োজনে শুধু রোবোট্যাক্সি নয়, তাদের আপডেট সংস্করণ ‘অপটিমাস’ নামের রোবটও প্রদর্শন করেছে। এই রোবটগুলো অতিথিদের দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে অতিথিদের পানীয় পরিবেশন করেছে। ইভেন্টের শেষে একদল রোবট ড্যাফট পাঙ্কের ‘রোবট রক’ গানের সঙ্গে নাচও প্রদর্শন করে।
মাস্ক জানিয়েছেন, ‘অপটিমাস’ রোবটের দাম রোবোট্যাক্সির মতোই ৩০ হাজার মার্কিন ডলার হতে পারে। তিনি আরও জানান, আগামী বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত রোবোট্যাক্সি চালু হতে পারে। ২০২৬ সালে উৎপাদন শুরু হবে রোবোক্যাবের। তবে মাস্কের এই সময়সীমা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
২০১৬ সালেই মাস্ক ঘোষণা করেছিলেন, টেসলার স্বচালিত গাড়ি আগামী দুই বছরের মধ্যেই আসছে। এরপর ২০১৮ সালে তিনি আবারও বলেন, স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলবে এমন গাড়ি ঠিক এক বছরের মধ্যেই চালু হবে। তবে ২০১৯ সালেও পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালু হয়নি।
২০২৩ সালের মধ্যে রোবোট্যাক্সি বাজারে আনার পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক জানিয়েছিলেন, টেসলার তৈরি রোবোট্যাক্সি বাজারে আসবে আগামী ৮ আগস্ট। তবে এই দিনেও নিজেদের তৈরি রোবোট্যাক্সি উন্মোচন করতে পারেনি টেসলা। অবশেষে গত সপ্তাহে রোবোট্যাক্সি উন্মোচন করেছে কোম্পানিটি। সাইবারক্যাব বিষয়ে খুব বেশি তথ্য জানায়নি টেসলা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে টেসলা তার প্রতিযোগী কোম্পানি ওয়েমো ও ক্রুজের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সির বহর চালু করেছে। যদিও বহরে গাড়ির সংখ্যা কম। টেসলা অবশ্য ব্যয়বহুল লিডার প্রযুক্তির পরিবর্তে তাদের গাড়িগুলোর ক্যামেরা ও কম্পিউটার সিস্টেমের ওপর নির্ভর করবে। এটি বেশ সাশ্রয়ী হলেও অনেকের কাছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিডার (LiDAR) এক ধরনের রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি, যা একটি বস্তুর ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। এটি লেজার আলোর পালস পাঠিয়ে এবং তারপর প্রতিফলিত আলোকে গ্রহণ করে কাজটি করে। প্রতিফলিত আলোর সময় এবং তীব্রতা পরিমাপ করে লিডার বস্তুর দূরত্ব, আকার ও আকৃতি নির্ধারণ করে।
টেসলার স্বয়ংক্রিয় চালনার নিরাপত্তা ইতোমধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে টেসলার গাড়িতে অটোপাইলট চালু থাকা অবস্থায় টেক জায়ান্ট অ্যাপলের এক ইঞ্জিনিয়ার দুর্ঘটনায় মারা যান। এতে তার পরিবার টেসলার বিরুদ্ধে মামলা করে। এ বছরের শুরুর দিকে টেসলা তার পরিবারের সঙ্গে মামলা মীমাংসা করেছে। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ সফটওয়্যারকে গতিসীমা লঙ্ঘন ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে রিকল করতে বাধ্য করে। পরে এটি ইন্টারসেকশনের কাছাকাছি গাড়ি চালানোর সময় বেশি বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অটোনোমাস গাড়ি বিশেষজ্ঞ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনার আইনের অধ্যাপক ব্রায়ান্ট ওয়াকার স্মিথ মন্তব্য করেছেন, ‘প্রতিবছর টেসলা আমাদের একটা ডেমো দেখাচ্ছে, তবে সেটা আমাদের আশ্বস্ত করতে পারছে না। আমি জানি না কেন খবরের শিরোনাম হয়, টেসলা কী ঘোষণা করবে? বরং হওয়া উচিত ‘টেসলা কেন মনে করে আমরা এত বোকা?’ সূত্র: ডেইলি মেইল