রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পুরোনো ৯টি বাস ও ৩টি মাইক্রোবাস বিক্রির জন্য গেল বছরের ২১ অক্টোবর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্র কিনতে বা জমা দিতে আসা একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল নিজেদের বিএনপির নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারপর বিষয়টি নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশ হলে কর্তৃপক্ষ দরপত্র বাতিল করে। পরে আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পরের বার নির্ধারিত সময়ে দরপত্র জমা না দিলেও বাস কেনার সুযোগ পেয়েছেন রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানার ডাঁসমারী এলাকার রফিকুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ টেন্ডারবক্স খোলার পর তার দরপত্র গ্রহণ করেন। এ ছাড়া সিন্ডিকেট করে অন্য কোনো ঠিকাদারকে দরপত্র কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করে একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, এতগুলো বাস কেনার অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তার নেই। অন্য কোনো ব্যক্তি তাকে দিয়ে দরপত্র কিনিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় দরপত্র কেনার শেষ দিন ছিল ১৫ জানুয়ারি। এ ছাড়া জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৯ জানুয়ারি দুপুর পৌনে ৪টা। আগের দরপত্রে ৯টি বাসের প্রস্তাবিত মূল্য ১০ লাখ থাকলেও এবার তা করা হয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা এবং মাইক্রোবাসের মূল্য ধরা হয় ৩ লাখ টাকা। ১২টি পণ্যের বিপরীতে দুটি প্রতিষ্ঠান ও একজন ব্যক্তি ৩৬টি দরপত্র কিনে দাখিল করেন। নিয়মানুসারে ১২টি পণ্যের জন্য কমপক্ষে ৩৬টি দরপত্র দাখিল করতে হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দরপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল। কিন্তু কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র দাখিল করেননি। পরে ৩টা ৪৬ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের দপ্তরে পরিবহন প্রশাসকের উপস্থিতিতে সিলগালা করা বাক্সের তালা খোলা হয়। তালা খোলার আরও দুই মিনিট পর পর দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এক ব্যক্তি একসঙ্গে ৩৬টি দরপত্র জমা দিতে আসেন। কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণও করেন।
জানা গেছে, দরপত্র দাখিল করা দুই প্রতিষ্ঠান হলো, শাহী মেটালিক হাউস ও মেসার্স শিথিল কনস্ট্রাকশন এবং ব্যক্তি হচ্ছেন রফিকুল ইসলাম। দরপত্রে রফিকুল ৯টি বাসের প্রতিটির জন্য সর্বনিম্ন মূল্য দিয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ও সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার ৩০০ টাকা। দরপত্রে রফিকুল ৩টি মাইক্রোবাসের প্রতিটির জন্য সর্বনিম্ন মূল্য দিয়েছেন ১৭ হাজার ৯০০ টাকা ও সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন ১৮ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে মাইক্রোবাস ৩টির মূল্য অনেক কম হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সেগুলো বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাসগুলো দাখিল করা মূল্যেই কিনতে পারবেন রফিকুল ইসলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও পরিবহন দপ্তর সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও একজন বাস মেকানিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাণভেদে প্রতিটি বাস ৩ থেকে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। অধিকাংশ বাসের ইঞ্জিন ও বডি জাপানি প্রতিষ্ঠানের হওয়ায় দাম একটু বেশি পাওয়া যাবে। তা ছাড়া কয়েকটি বাসের ইঞ্জিনের অবস্থা এখনো ভালো আছে। সর্বোপরি বাসগুলো কেজি দরে বিক্রি করলেও ২ লাখের বেশি টাকা পাওয়া যাবে।
দরপত্রে সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কোনো সিন্ডিকেট করে দরপত্র কিনিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরে আমি নিয়মিত যাতায়াত করি। আমি এসব টেন্ডার সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের পরামর্শে আমি মূল্য নির্ধারণ করে দাখিল করেছি। আমার দেওয়া মূল্য বেশি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হয়তো আমাকে বাসগুলো হস্তান্তর করবে।’
অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমি তৃতীয় শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি কাজ করেছি। আমার পরিবার ও আত্মীয়দের থেকে কিছু টাকা নিয়েছি।’ তবে কোনো ধরনের আয়কর দেন না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সরকার বলেন, ‘এর আগেও সিন্ডিকেট হওয়ার কারণে ও মূল্য কম থাকায় দরপত্র বাতিল করা হয়েছিল। তবে এবার সিন্ডিকেট করা হয়েছে কি না তা জানি না। মোটামুটি মূল্যে দরপত্র দাখিল করায় বাসগুলো আমরা হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তবে নির্দিষ্ট সংখ্যক দরপত্র বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
বাক্স খোলার পর দরপত্র জমা নেওয়ার কোনো নিয়ম আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাক্স খোলার পর দরপত্র জমা নেওয়ার আইনগত কোনো নিয়ম নেই। বাক্স খোলার সঙ্গে সঙ্গে তারা এসে জমা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করায় আমরা তা গ্রহণ করি।’