বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজও সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হিসেবে উপস্থিত আছেন আমাদের মাঝে। সাম্যের আর মানবতার গান রচনার ক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয় স্থান দখল করে আছেন এতকাল পরেও। তার সাহিত্য ও সংগীতের মাঝে যেন এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। ত্রিশাল তার জীবনের এমন একটি অধ্যায় যেখানে শৈশবের দুরন্তপনা, সৃষ্টিশীল কল্পনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে তার গভীর সংযোগের সূচনা হয়। এই ত্রিশালের প্রকৃতি আর সংস্কৃতির সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছিল কবির ভবিষ্যতের সাহিত্যিক দিশা, সৃষ্টি হয়েছিল এক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি।
১৯১৪ সালের এক সন্ধিক্ষণে কবি নজরুল আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তখন আসানসোলে রুটির দোকানে কাজের সময় তার জীবনে দেখা মেলে রফিজউল্লাহ নামের এক দারোগার। তার সহায়তায় নজরুল বাংলাদেশে আসেন, ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ত্রিশালের শান্ত, মনোরম প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের সহজ-সরল জীবন তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি শুকনি বিলের পাড়ে অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে বাঁশি বাজাতেন, গাইতেন গান। স্থানীয়রা তাকে ‘দুখু মিয়া’ নামে চিনতেন। এই অঞ্চল তাকে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল কল্পনার দুনিয়ায় নিয়ে যায় এবং তার ভবিষ্যৎ সাহিত্যিক সত্তার বীজ বপন করে।
ত্রিশালের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি কবির সৃজনশীলতা ও আদর্শের এক অনন্য তীর্থ। এখানে প্রতিটি বিভাগের জন্য ‘নজরুল অধ্যয়ন’ বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, যেমন আবাসিক হল, মেডিকেল সেন্টার, মঞ্চ, লাইব্রেরি, এমনকি পরিবহন ব্যবস্থার নামকরণও করা হয়েছে নজরুলের সাহিত্য ও জীবন থেকে, যেমন বিদ্রোহী হল, অগ্নিবীণা হল, দোলনচাঁপা হল, শিউলিমালা হল, ব্যথার দান মেডিকেল সেন্টার এবং পরিবহনের জন্য বিদ্রোহী ও প্রলয়োল্লাস বাস। কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধের নামকরণ করা হয়েছে নজরুলের অমর পঙ্ক্তি, ‘চির উন্নত মম শির’ থেকে।
ত্রিশালেই প্রথম নজরুলের সাহিত্যিক এবং সুরসৃষ্টির বীজ রোপিত হয়েছিল। এখানকার দরিরামপুর স্কুল, যা বর্তমানে ‘নজরুল একাডেমি’ নামে পরিচিত, তার জীবনের স্মৃতিচিহ্ন ধরে রেখেছে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী। প্রতি বছর এই অঞ্চলে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন করা হয়, যা ১৯৬৫ সালে শুরু হয়েছিল। আজ ত্রিশাল নজরুল-তীর্থ হিসেবে পরিচিত, যেখানে তার সাহিত্য ও সুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসেন।
ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’। এখানে পিএইচডি এবং এমফিল প্রোগ্রামের মাধ্যমে নজরুল গবেষণা এগিয়ে চলছে। কবির পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন বৃত্তি, যেমন ‘প্রমিলা বৃত্তি’, ‘বুলবুল বৃত্তি’ এবং ‘কাজী অনিরুদ্ধ বৃত্তি’।
ত্রিশালের মাটিতে নজরুল শুধু সময় কাটাননি; এখান থেকেই তার জীবনের মূলমন্ত্র, সাম্য বোধ এবং বিদ্রোহী সুরের গোড়াপত্তন ঘটেছে। ত্রিশাল তাই শুধুই একটি স্মৃতি নয়, এটি কবির চেতনা, আদর্শ এবং সৃষ্টিশীলতার এক অনন্ত সোপান।
/রিয়াজ