ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজিত আনন্দ শোভাযাত্রায় নির্মিত মূল ছয়টি মোটিফের মধ্যে একটি দানবীয় ফ্যাসিবাদের প্রতীকী মুখাকৃতি শনিবার (১২ এপ্রিল) ভোর ৪টা ৫০মিনিটে দুর্বৃত্তের আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে। পাশাপাশি আংশিকভাবে পুড়েছে আরেকটি মোটিফ শান্তির প্রতীক পায়রা। এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া সকালে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পরে মামলা করা হয়।
শনিবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর। এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে, বলে জানা গেছে। ওই ভোর ৪টা ৪৪ মিনিট থেকে ৪টা ৫০ মিনিটের মধ্যে আগুন লাগিয়ে বের হয়ে যায় অপরিচিত সেই যুবক।
এ ব্যাপারে প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘চারুকলার মাঝখানের গেট (৩ নং গেট) টপকে প্রবেশ করে। কোথা থেকে ছেলেটা এসেছে সেটা বোঝা যায়নি। প্রথমে সে লিকুইড (দাহ্য পদার্থ) দিয়েছে, তারপর সে পর্দার আড়ালে চলে গেছে। তারপর ফুটেজে আমার দেখলাম, সেখানে ফ্লেম (অগ্নি শিখা) হয়েছে। এর মানে হয়তো সে সেখানে লাইটার চালিয়ে পরীক্ষা করেছে। তারপর সেখানে গিয়ে ফায়ার করেছে। ছেলেটা যে গেট দিয়ে প্রবেশ করেছে সেই গেট দিয়েই বেরিয়ে ছবির হাটের দিকে গেছে।’
অজ্ঞাত ওই যুবকের পরনে কালো টি-শার্ট, বাদামী প্যান্ট, কালো স্যান্ডেল ছিল। এমন ঘটনা উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে উল্লেখ করে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এটা উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে, খুব সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের পক্ষের একটা শক্তি এখানে ঘাপটি দিয়ে আছে। তারাই এই কাজ করেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছি। একটা সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং আইনিভাবে শক্তহাতে দেখা হবে।’
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল রেকর্ডগুলো নিব, ফরেনসিক করব। ডিটেকশন করে ফেলব। যে এখানে আগুনটা লাগিয়েছে, তাকে ডিটেক্ট করতে পারলে তার মাস্টারমাইন্ড কারা বা এটার সঙ্গে কারা জড়িত এইটার ডিটেইল আমরা পরে বলতে পারব।’
পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত কমিটি গঠন
এই ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
তদন্তের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক, আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল, সহকারী প্রক্টর ড. এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী, সহকারী প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
চারুকলায় ফ্যাসিবাদের মুখোশে আগুন পরিকল্পিত: ঢাবি সাদা দল
এমন ঘটনা পরিকল্পিত উল্লেখ করে আগুন দেওয়ার এই ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাবির বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি।
শনিবার এক বিবৃতিতে সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এই দাবি জানান।
বিবৃতিতে সাদা দলের নেতারা অবিলম্বে চারুকলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রতিবাদে ছাত্রদল-ছাত্র ফ্রন্ট-গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এবং জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল-ছাত্র ফ্রন্ট ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। ছাত্রদল ও ছাত্র ফ্রন্ট পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবাদ জানায় এবং জড়িত শাস্তি দাবি তোলেন।
শনিবার ঢাবি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে রাত ৮টায় আগুন লাগানোর প্রতিবাদ এবং মোটিফ দুটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করা কথা ছিল বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের। পরে মার্চ ফর গাজা এবং ভর্তি পরীক্ষার বাস্তবতায় ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতে আজকের বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করে সংগঠনটি।
প্রসঙ্গত, ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি দেখতে অনেকটাই দেশের ক্ষমতাচ্যুত ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেহারার সঙ্গে মিলে। এবারের শোভাযাত্রার প্রধান এই প্রতিকৃতিটি ফ্যাসিবাদের বীভৎস রূপ হিসেবে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দাঁতাল মুখের এক নারীর মুখাবয়ব। মাথায় খাড়া চারটি শিং, হা করা বিকৃত মুখ, বিশাল আকৃতির নাক, ভয়ার্ত দুটো চোখ।
ওই মোটিফ প্রসঙ্গে এর আগে শুক্রবার চারুকলা অনুষদের ওসমান জামান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘এটি একটি নির্বতনমূলক ব্যবস্থার একটি প্রতীকী মুখাবয়ব, এখন যদি কেউ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দেখতে চায়, সেটি তার স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ এবং যদি প্রতীকী অর্থে দেখতে চায় সেটিও দেখতে পারে। একইভাবে পানির বোতলটিইও তাই, একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেও দেখতে পারেন এবং ওই সময়ের আবহ বোঝার জন্য যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এবং পানি বিতরণ করা হচ্ছে। যে যেভাবে দেখে এটি শিল্পের বহিঃপ্রকাশ।’
/আরিফ জাওয়াদ/মাহফুজ