১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হয় বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রা। তার সাত বছর পর, ’৯৬ সালে নাম পরিবর্তন করে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়। নাম পরিবর্তনের ২৯ বছর পর দেশের পটপরিবর্তনে সেই পুরোনো নামে ফিরলে পরিবর্তনের যথার্থ কারণ জানতে চান চারুকলার বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (১৩ এপ্রিল) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কারণ দর্শানোর আহ্বান জানান তারা। এ সময় তারা ’৯৬ সালে নাম পরিবর্তন হলে সেটি অন্যায় ছিল বলে উল্লেখ করেন।
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা করা হয়েছে- এমন সিদ্ধান্ত সমর্থন করছেন না বলে উল্লেখ করে চারুকলার প্রিন্ট মেকিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাহরা নাজিফা বলেন, ‘চারুকলার শিক্ষার্থীদের কোনো মতামত ছাড়াই এ ধরনের সিদ্ধান্তের ওপর প্রশ্ন রাখছি। তা ছাড়া আমরা এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করছি না। বলা হচ্ছে, ১৯৯৬ সালে নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জন্য ব্যবহার শুরু করা হয়। অথচ আওয়ামী লীগ ক্ষমতাতেই আসে ১৯৯৬-এর বৈশাখের তথা এপ্রিলের আরও তিন মাস পর।’
নাম পরিবর্তনে সমস্যা নেই, যৌক্তিক কারণ জানতে চেয়ে ইনস্টিটিউটের সাবেক শিক্ষার্থী জাহিদ জামিল বলেন, ‘নামটা নিয়ে সেদিন কথা বলি। সেখানে চারুকলার ডিন বলেছেন, তারা চেষ্টা করছেন যেন নাম অপরিবর্তিত থাকে। পরে অজুহাত দেখিয়ে নাম পরিবর্তন করা হয়। নাম পরিবর্তনের কোনো যৌক্তিক কারণ তিনি জানাননি। নাম পরিবর্তনে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা যৌক্তিক কারণ জানতে চাই। ১৯৯৬ সালের পরিবর্তন অন্যায় হলে এটাও অন্যায়।’
এর আগে গত ১০ এপ্রিল বেলা ১১টায় চারুকলা অনুষদের ওসমান জামান মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শোভাযাত্রা নামকরণের ঘোষণা দেন বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্যসচিব ও চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাপক এই আয়োজনের লক্ষ্যে শোভাযাত্রার নামকরণ করা হয়েছে বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা, যার ছায়াতলে দেশের সব বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটবে। প্রতিফলিত হবে, বর্তমানের সব শ্রেণির মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ফুটে উঠবে শোভাযাত্রার প্রকৃত আনন্দ।’
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম কেন পরিবর্তন করা হলো, এখানে ইসলামি দলগুলো বা কোনো চাপের প্রভাব রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এখানে পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নেই, আমরা পুনরুদ্ধার করেছি পুরোনো নাম। চাপের বিষয়টি আমরা সেভাবে মূল্যায়ন করতে চাইছি না, তবে প্রতিবছরই বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। গত সময়গুলোতে মঙ্গল শোভাযাত্রা ফ্যাসিবাদীরা এমনভাবে ব্যবহার ও চর্চা করেছে যে, একটা খারাপ অনুভূতি রয়েছে এই সমাজে। তাই, আমরা অতীতে ফিরে যেতে চাই, যেখানে সব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল এবং সাংস্কৃতিক জায়গায় কোনো রাজনৈতিক আগ্রাসন ছিল না।’
প্রসঙ্গত, স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার প্রবর্তন হয়। ওই বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এ শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতিবছর অব্যাহত রাখে। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে। নাম পরিবর্তনের ২৯ বছর পর ফের সেই পুরোনো নামে ফিরল আনন্দ শোভাযাত্রা। গত ১০ এপ্রিল এক শোভাযাত্রায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।