নানা আয়োজন, বর্ণিল উৎসব আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে বরণ করে নেওয়া হলো বাংলা ১৪৩২ সালের প্রথম দিন ‘পয়লা বৈশাখ’। করোনা মহামারি ও পবিত্র মাহে রমজানের কারণে কয়েক বছর ধরে এ উৎসব স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত না হওয়ায় এবার বাঙালিদের আগ্রহ একটু বেশিই ছিল। সারা দেশে দিনটিকে বরণ করে নেওয়া হয় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হালখাতা ও বর্ষবরণ শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় বাঙালি জাতি। রাজধানী ঢাকা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারের আয়োজন ছিল বেশ চমকপ্রদ।
সকাল সকালেই বৈশাখের হাওয়া লেগেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে সকাল থেকেই ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। এবারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শোভাযাত্রায় চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে ছিল গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতি এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর বিভিন্ন মোটিফ ফুটিয়ে তোলা। শোভাযাত্রায় বাউল, বর-নববধূ, কৃষকসহ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হন শত শত শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রবেশপথে দেখা যায় গ্রামের এক নারী মেঝেতে বসে নিজ হাতে শীতলপাটি বুনছেন। পাশেই চলছে গরু-দৌড় প্রতিযোগিতা। কিছু মানুষ খেলছে হাডুডু। আরেকটু দূরেই সাঁকো পার হচ্ছে কয়েকজন কিশোর। সাইকেলের পুরোনো টায়ার দিয়ে খেলা করছে এক বালক। ঠিক এক মুহূর্তে যেন কয়েক দশক আগের গ্রাম-বাংলায় চলে গিয়েছিলাম। এমন দৃশ্যগুলো পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে অনুষদের অধ্যাপক হীরা সোবহানের আয়োজিত একটি স্ক্রলচিত্র প্রদর্শনীতে দেখা গেছে।
আলপনা আঁকা রাস্তায় হেঁটে প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে সামনে এগোলে দেখা যায় রক্তাক্ত এক ব্যক্তি তাকিয়ে আছে খোলা আকাশের দিকে। রক্তে ভেজা এক শিশুর লাশ পড়ে আছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কংক্রিটের ভবনের নিচে। পাশেই রয়েছে ফিলিস্তিনের পতাকা। এবারের শোভাযাত্রায় স্থান পেয়েছিল ফিলিস্তিনের পতাকা, মিসাইল, জুলাই আন্দোলনের আলোচিত হাতুড়ি ও বিভিন্ন স্লোগান। দিনটিতে কেউ সেজেছে বাউল, কেউ বর, কেউবা আবার কনে, কৃষকসহ নানা সাংস্কৃতিক সাজে। বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচের ঢেউ শোভাযাত্রার আনন্দ আরও বৃদ্ধি করে দেয়।
বর-কনে সেজেছিলেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী হামিম ও আরশি। তারা জানান, কয়েক বছর পর বর্ষবরণের সুযোগ হয়েছে তাদের। অনেকে অনেক কিছু সাজলেও আরশির বউ সাজতে ভালো লাগে। ভালো লাগার একটা জায়গা থেকে এবারের নববর্ষে বধূর বেশ ধারণ করেন তিনি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ নয়, বৈশাখের হাওয়ায় মাতোয়ারা ছিল অন্য বিভাগগুলোও। অন্য বিভাগগুলোর একটি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। বিভাগের সাজসজ্জায় ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। সকাল থেকেই ছিল শিক্ষার্থীদের সমাগম। সকালের শুরুতেই বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীদের মুড়ি-মুড়কি খাওয়ানো হয়। তারপর শুরু হয় ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’। শুধু শোভাযাত্রাই নয়, বিভাগটি আয়োজন করেছিল মেলারও। বিভাগের শিক্ষার্থীরাই বিভিন্ন দোকান ও খেলাধুলা পরিচালনা করেছে। রিং নিক্ষেপ, বল নিক্ষেপ, ডাইস (লুডুর ছক্কা নিক্ষেপ), বোতলে চুড়ি পরানো খেলাগুলো যেন শৈশবের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগগুলোও নানা আয়োজনে দিন কাটায়। শোভাযাত্রা পরবর্তী সময়ে গান গেয়ে দিন পার করেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমপ্লেক্স ভবনের সামনে থেকে ভেসে আসছিল বাউল গানের সুর। সেখানে গিয়ে দেখা যায় ইতিহাস বিভাগের একদল শিক্ষার্থী বাউল আড্ডায় মগ্ন। নওগাঁর বাউল কাউসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাণবন্ত সময় কাটাচ্ছিলেন তারা। তাদের পাশেই বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও গানের আড্ডায় মেতেছিল।
দীর্ঘদিন পর নববর্ষকে বরণের সুযোগ পেয়ে সবার অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সবাই প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেও পান্তা ইলিশের স্বাদ পায়নি অধিকাংশ শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত দাম বেশি হওয়ার কারণে সবার সাধ্যে ছিল না ইলিশ মাছ। সাধ্যে ইলিশ না থাকলেও সবার মধ্যে নববর্ষকে আপন করে বরণ করার প্রয়াস ছিল চোখে পড়ার মতো।
/রিয়াজ