‘সমাজের কাজ কেবল টিকে থাকার সুবিধা দেওয়া নয়, মানুষকে বড় করে তোলা, বিকশিত জীবনের জন্য মানুষের জীবনে আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়া।’ প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘জীবন ও বৃক্ষ’র এই বাক্য থেকেই যেন অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন পণ্ডিত মৌলভী আবদুর রহমান।লক্ষ্মীপুরের জেলার রামগঞ্জ উপজেলার একেবারে প্রান্তিক গ্রাম দল্টায় জন্ম পণ্ডিত মৌলভী আবদুর রহমানের। নিজ গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ‘বিকশিত জীবনের জন্য’ শত বছর আগে একটি স্কুল গড়ে তোলেন তিনি। ১৯২৫ সালের পয়লা জানুয়ারি তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করে এলাকার জ্ঞানপ্রদীপ ‘দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’।
সেই থেকেই এই বিদ্যাপীঠটি শিক্ষা-সভ্যতার আলো ছাড়িয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলে। ১৯৯৩ সালে এই বিদ্যালয় থেকে জন্ম নিয়েছে স্থানীয় মহাবিদ্যালয় ‘দল্টা কলেজ’। তার ব্যাপ্তিও থেমে নেই। ‘দল্টা ডিগ্রি কলেজ’ নাম নিয়ে এখন এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। প্রান্তের এই প্রতিষ্ঠান থেকে জ্ঞান অর্জন করে শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে পড়ছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সবখানে।
মৌলভী আবদুর রহমান শত বছর আগে এই প্রান্তের মানুষের জন্য কেবল শিক্ষার আঁধার গড়েছেন তা নয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় গড়েছিলেন হাসপাতালও। তৎকালীন আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতে তার চেষ্টায় হয়েছিল এলাকার পোস্ট অফিস এবং স্থানীয় দল্টা বাজার। জানা গেছে, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে তার নিজের সম্পত্তি ছাড়াও তার সহোদর ভাই আবদুল মজিদ পালেরও অবদান আছে।
ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় শুরুতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। পরে ১৯৫৪ সালে বিদ্যালয়টি থেকে প্রথম ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের একজন আবদুর রহমান। পাশের গ্রাম জাফরনগর মোল্লা বাড়ির এই প্রবীণ স্থানীয়দের কাছে ‘রহমান ডাক্তার’ নামে পরিচিত। টানা তিন মেয়াদে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে মোট ছয় বছর সভাপতি ছিলেন তিনি।
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌলভী আবদুর রহমান জীবনের বেশ অনেকটা সময় আমেরিকায় কাটিয়েছেন। পাশ্চাত্য থেকে নিজ গ্রামে ফিরে বিদ্যালয়টি গড়েন। সে সময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্টও (বর্তমানে চেয়ারম্যান) হন মৌলভী আবদুর রহমান। প্রথমে বিদ্যালয়টি টিন ও কাঠের তৈরি একতলা ঘর ছিল। পরে ১৯৬৬ সালের দিকে একই ইউনিয়নের ভাটরা দক্ষিণ পাড়ার বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব কে. এম ওবায়দুল হকের চেষ্টায় দোতলা পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
বিদ্যালয়ের আরেক সাবেক শিক্ষার্থী সামছুল আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌলভী আবদুর রহমান ৯০-৯৫ ডেসিমেল জমির ওপর বিদ্যালয়টি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে আরও তিন একর জমি নিয়ে বিদ্যালয়ের জন্য খেলার মাঠ বানান ক্রীড়া সচেতন মৌলভী আবদুর রহমান।
এই বিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে এসএসসি পাস করেন মোহাম্মদ হারুন আল রশিদ (বুলবুল মজুমদার)। তিনি জানান, মৌলভী আবদুর রহমান পশ্চিমবঙ্গের আলীপুর ইনস্টিটিউট থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার পর কলকাতা মিউনিসিউপ্যাল করপোরেশনে রাজস্ব আধিকারিক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে ফিরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়াসহ সামাজিক কাজে নিজেকে উজাড় করে দেন তিনি।
মৌলভী আবদুর রহমান ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের একজন মানুষ। তাকে সহযোগিতা করা মানুষগুলোর নাম দেখেই বিষয়টা আঁচ করা যায়। সামাজিক উন্নয়নে তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা কাজ করেছেন তারা হলেন- আলী আকবর পাল, জিতেন্দ্র রায় চৌধুরী, আফাজউদ্দিন আহমেদ মজুমদার, জয়নাল আবেদীন মুন্সী, জালাল আহমেদ, ভট্টাচার্য, নুরুল ইসলাম মজুমদার, মৌলভী জাফর আহমদ ভূঁইয়া, মাহবুবুর রহমান পাল প্রমুখ।
সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দেশে-বিদেশে থাকা সাবেক শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। উদযাপনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে একটি সংগঠনও গড়েছেন তারা। সংগঠনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’। মৌলভী আবদুর রহমানের আদর্শকে সামনে রেখে এই সংগঠনের মাধ্যমে বিদ্যালয় তথা সমাজকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখতে চান সাবেক শিক্ষার্থীরা।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন
/রিয়াজ