দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জলাশয় ও পরিবেশের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে কচুরিপানা। একইভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেনিম বর্জ্যের পরিমাণ, যা পরিবেশ দূষণে রাখছে বড় ভূমিকা। কিন্তু এই দুই সমস্যাকেই একসঙ্গে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলসের (বুটেক্স) চার শিক্ষার্থী।
তারা প্রথমবারের মতো কচুরিপানা এবং পুনর্ব্যবহৃত জিন্স ব্যবহার করে তৈরি করেছেন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জুতা। যেটির নাম দিয়েছেন ‘ইকো-স্টেপ’। এই অভিনব উদ্যোগ দেশের টেক্সটাইলস ও পরিবেশ প্রযুক্তিতে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছে।
কচুরিপানা আদতে এ দেশের উদ্ভিদ নয়। ১৮৮৪ সালে ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গল থেকে এটি এ দেশে আনা হয়। দ্রুত বংশবিস্তারের ক্ষমতার কারণে এটি জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটির কারণে জলাশয়ে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয় প্রায়ই। ফলে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটে, আর মাছ চাষে হয় ক্ষতি।
অন্যদিকে, ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গ ডেনিম বা জিন্স তৈরির পর বর্জ্য হিসেবে প্রতি বছর জমা হচ্ছে প্রায় ২ দশমিক ১৬ মিলিয়ন টন কাপড়। ফলে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট। এই সংকট মোকাবিলার চিন্তা থেকেই প্রথমে তাশফিক হোসাইন, অর্ণব হালদার অভি, ফারদীন বিন মনির এবং অন্বয় দেবনাথ শুরু করেন গবেষণা। তাদের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ল্যাবের অধীনে। যার সুপারভাইজার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ড. মার্জিয়া দুলাল।
জুতার ইনসোল ও ডেকোরেটিভ লেইস তৈরি করা হয়েছে কচুরিপানা দিয়ে। শুকনো কচুরিপানার কাণ্ড হাতে ব্রেইড করে তৈরি করা হয় লম্বা স্ট্র্যান্ড। পরে তা দিয়ে ব্রেইডেড উইভ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় ইনসোল। অন্যদিকে, জুতার বাইরের অংশ তৈরি হয়েছে ফেলে দেওয়া ডেনিম কাপড় দিয়ে।
এই অনন্য ডিজাইনে রয়েছে উচ্চ-নিম্ন গড়নের কচুরিপানা উইভ। যাতে পা রাখলে আরামদায়ক অনুভূতি পাওয়া যায়। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার হওয়ায় এটি সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। যার জন্য সময় লাগবে ৩-১২ মাসের মতো। পাশাপাশি এই জুতার সঠিক যত্ন নিতে পারলে এক বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট দিলে অবশ্য এই সময়সীমা বাড়তে পারে ২-৩ বছর পর্যন্ত।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের দাম সাধারণত বেশি হয়। অনেক সময় যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে। কিন্তু ‘ইকো স্টেপ’ ভেঙে দিয়েছে সেই ধারণা। এক জোড়া জুতা তৈরি করতে খরচ মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা।
এই জুতা যদি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারে, তবে কচুরিপানার সমস্যাকে সম্পদে রূপান্তর করে ফেলা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ডেনিম বর্জ্যও পাবে কার্যকর পুনর্ব্যবহারের পথ। এতে করে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত, উদ্ভাবনী গবেষণা এবং পরিবেশ রক্ষা- এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই খুলে যাবে সম্ভাবনার নতুন দরজা।
/রিয়াজ