ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। প্রচারের পাশাপাশি চলছে তর্কযুদ্ধ। নানা যুক্তি আর অভিযোগের তির ছুড়ে প্রার্থীরা একে অন্যকে মোকাবিলার চেষ্টা করছেন ভার্চুয়াল জগতেও। ফলে জনমত কারও বেড়ে যাচ্ছে, কারও কমছে। মিডিয়া অঙ্গনে, বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সন্ধ্যার পর পরই নানা টকশোতে বাকযুদ্ধে মেতে উঠছেন প্রার্থীরা। সেখানে চলছে তর্ক-বিতর্ক আর নানা অভিযোগের যুক্তি খণ্ডন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক প্রচারের আগে থেকেই প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশনসহ নানা মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চেষ্টা করেন। অনেকেই ব্যতিক্রমী পন্থায় দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করেন। এতে ব্যাপক সাড়াও পান। নির্বাচনি আমেজ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রথম সারির টেলিভিশনেও প্রার্থীদের নিয়ে সরাসরি সংলাপের আয়োজন হচ্ছে ক্যাম্পাসে। সেখানে প্রার্থীরা তাদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরছেন। কোনো কোনো প্যানেলের প্রার্থীরা ব্যাপক তর্ক-বিতর্কেও লিপ্ত হচ্ছেন। এতে জনমত ওঠানামা করছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত ডাকসুকেন্দ্রিক একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোর খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বেশ সমালোচনার জন্ম হয়। এক পক্ষ প্রশংসা কুড়ায়, আরেক পক্ষ সমালোচিত হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, টকশোর প্রশ্নোত্তর পর্বে সাদিকুল ইসলাম মাসুম নামের এক শিক্ষার্থী ছাত্রদল মনোনীত এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদকে প্রশ্ন করেন, ‘ডাকসু প্রতিবছর হওয়া আমাদের মৌলিক অধিকার। অথচ আপনারা দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন বন্ধ রেখেছিলেন। এবার জয়ী হলে কি একই অবস্থা চলবে? গণরুম ও গেস্টরুম আবার চালু করবেন কি না?’
এই প্রশ্নের উত্তরে মায়েদ বলেন, ‘আপনি যদি সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন তাহলে আমি দুঃখিত। তবে আমার ধারণা, আপনি শিবির কর্মী। আর সে কারণেই শিবিরের ন্যারেটিভ ব্যবহার করছেন।’
এমন মন্তব্যের পর উপস্থিত শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে। বিশেষত স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী হাসিবুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ করেন। হাসিবুল ইসলামের এই অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করেন মায়েদ। এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘প্রশ্ন শুনে আমার মনে হয়েছিল তিনি আমাদের ইশতেহার ভালোভাবে পড়েননি। সেই কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ভুল শব্দ ব্যবহার করেছি, যা ঠিক হয়নি। তবে বক্তব্যের শুরু ও শেষে আমি দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম, অনেকেই হয়তো সেটা খেয়াল করেননি।’
এ রকম অসংখ্য টকশোর খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে প্রার্থীদের সাইবার বুলিংসহ চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি অনুষ্ঠানের একটি অংশের সঙ্গে আরেকটি প্রোগ্রামের খণ্ডিত অংশ যুক্ত করে প্রার্থীদের ট্রল করা হচ্ছে। এই প্রবণতা নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিচ্ছে ভোটারদের মাঝে।
এ প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সোহানুর রহমান শুভ খবরের কাগজকে বলেন, ‘টকশোর খণ্ডিত বক্তব্য অনেকাংশে যেমন ইতিবাচক ধারণা দেয়, তেমনি একধরনের নেতিবাচক ধারণাও পাওয়া যায়। গত বৃহস্পতিবারের টকশোতে একজন শিক্ষার্থী যে ধরনের প্রশ্ন করলেন, প্রশ্নটি যা-ই হোক, প্রার্থীর উচিত ছিল সেই শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। আমরা এমন কালচার চাইনি। আমরা চাই সুস্থ রাজনীতি, যেখানে গেস্টরুম-গণরুম থাকবে না।’
গতকাল শুক্রবার দুপুরে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় এসে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি (সহসভাপতি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান নেটে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারে কান না দিয়ে তা যাচাই-বাছাইয়ের অনুরোধ জানিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে অনলাইনে মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন ছড়ানোর অপচেষ্টা চলানো হচ্ছে। এমনকি আমাদের প্রার্থীদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার চেষ্টা হচ্ছে, একজনের আইডি হ্যাক করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বলব, যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, তারা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে যাচাই-বাছাই করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি কোনো অপরাধ, কোনো ভুল করে থাকি; আমরা ওপেন আছি। আমরা আপনাদের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত আছি।’
এর আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী বিন ইয়ামীন মোল্লা বলেন, ‘নানাভাবে ডাকসু বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বন্ধ করে রেখেছিলেন তারাই এখন নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে চাইছেন। আমরা আর এই দখলদারত্বের রাজনীতি চাই না। আমরা শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানাব, তারা যেন তাদের প্রকৃত বন্ধু খুঁজে নেন।’