এ কে এম শাকিল, সরকারি বাঙলা কলেজের এক তরুণ শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত তিনি। পরিবারের সদস্য বাবা-মা ও দুই ভাই। তিনি মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছেন মূলত বাবার কাছ থেকেই। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে দেখে তার হৃদয়ে গড়ে উঠেছে সমাজসেবার বীজ। সেই অনুপ্রেরণাই তাকে রক্তদানের মতো মহৎ কাজে সম্পৃক্ত করেছে।
প্রথম রক্তদানের গল্প
২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গোপালগঞ্জে গিয়েছিলেন শাকিল। পরীক্ষার আগের রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় হলে থাকার সুযোগ হয় তার। পরদিন সকালে পরীক্ষার কেন্দ্রে যাওয়ার পথে হলের গেটে এক মধ্যবয়সী মহিলাকে কাঁদতে দেখেন। জানা গেল, তার ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এ+ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন। সে সময় শাকিলেরও রক্তের গ্রুপ এ+। প্রথমবার রক্তদান করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। রক্ত দিয়ে হাসপাতালে থেকে বেরিয়ে দেখেন পরীক্ষা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলেও একজন মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন—এই তৃপ্তি তাকে অন্যরকম শক্তি জুগিয়েছিল। যদিও প্রথম রক্তদানের পর শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তারপরও মন ভরে গিয়েছিল এক অদ্ভুত শান্তিতে।
রক্তদানের পথচলা
প্রথম রক্তদানের পর থেকে এখন পর্যন্ত শাকিল ৩৫ বার রক্ত দিয়েছেন। ফেসবুকে পোস্ট, বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া কিংবা সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে তিনি রক্তদান করেন। তার মতে, দেশে রক্তদাতার অভাব নেই, কিন্তু প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক জীবন ঝরে যায়।
রক্তদানের নিয়ম ও সতর্কতা
শাকিলের মতে, সুস্থ যে কেউ, বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছর এবং ওজন ন্যূনতম ৪৫ কেজি হলে রক্তদান করতে পারে। তবে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বা ডায়াবেটিসের মতো রোগ থাকলে রক্তদান করা উচিত নয়।’
সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
ঢাকায় পড়তে এসে শাকিল লক্ষ্য করেন, হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়রা প্রায়ই বাঙলা কলেজ ক্যাম্পাসে রক্তদাতার সন্ধানে আসেন। তখন তিনি ‘বাঙলা কলেজ ব্লাডব্যাংক’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যা পরে বিস্তৃত হয়ে ‘৭ কলেজ ব্লাড অর্গানাইজেশন’-এ রূপ নেয়। এই সংগঠন সাত বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রক্তদান, ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সমাজসেবামূলক কাজ
২০২০ সালের করোনা মহামারিতে রক্তদান শেষে ক্ষুধার্ত কিছু শিশুকে খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে তার সমাজসেবার যাত্রা শুরু। এর পর থেকেই পথশিশুদের পড়ানো ও তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। কোভিডের সময় অসুস্থদের অক্সিজেন সেবা, খাবার বিতরণসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন তিনি। ২০২৪ সালে মজার ইশকুল, জুম বাংলাদেশ স্কুল ও প্রত্যয় শিশুকেন্দ্রে পড়ানোর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন।
রক্তদানে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা
প্রায় আট বছরের যাত্রায় শাকিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। গ্রামে উঠান বৈঠক, স্কুল-কলেজে ব্লাড ক্যাম্পেইন এবং অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মকে স্বেচ্ছায় রক্তদানের আহ্বান জানাচ্ছেন।
আগামী দিনের স্বপ্ন
শাকিলের স্বপ্ন— প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন রক্তদাতা তৈরি হোক। তিনি চান, সবাই শুধু নিজের প্রয়োজনে নয়, অন্যের প্রয়োজনেও রক্তদান করুক।