জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি সংগঠন ‘কালমেঘ’। এটি একটি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক সংগঠন। এই সংগঠন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে ভূমিকা রাখে।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে এই সংগঠনের নতুন পরিচালনা কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এই সংগঠনের পরিচালনা কমিটিতে রয়েছেন দুজন স্কোয়াড কমান্ডার, দুজন লজিস্টিক কমান্ডার এবং দুজন আউটরিচ কমান্ডার। নতুন পরিচালনা কমিটিতে স্কোয়াড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন মিফতারুল ইসলাম পাপ্পু এবং পাপিয়া চাকমা, লজিস্টিক কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন হোসেইন চৌধুরী এবং সজীব সরকার, আউটরিচ কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন শাওন বড়ুয়া এবং লুবনা। তারা সবাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সংগঠনের কর্মকাণ্ড এবং কর্মপরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে নবনিযুক্ত স্কোয়াড কমান্ডার মিফতারুল ইসলাম পাপ্পু বলেন, ‘কালমেঘ নামে একটি ঔষধি গাছ আছে। সেখান থেকেই মূলত এই সংগঠনের নামকরণ করা হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি সংগঠন। সংগঠনটি ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। আমাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুস্থ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করা।’
তিনি জানান, সপ্তাহে ছয় দিনই আমাদের সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৫টায় নজরুল ভাস্কর্য থেকে চিকনার মোড় পর্যন্ত দৌড় শুরু করা হয়। তারপর সেখান থেকে হেঁটে এসে নতুন কলাভবনের সামনে ১ ঘণ্টার মতো শরীরচর্চা করা হয়। এখানে মার্শাল আর্ট, যোগ ব্যায়াম, পুশ-আপ, সিট-আপ, প্ল্যাঙ্ক, স্কোয়াট, মেডিটেশনসহ প্রায় ৩০ রকম ব্যায়াম করানো হয়। এটি সপ্তাহে ৫ দিন, অর্থাৎ রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত করা হয় এবং প্রতি শুক্রবার ১০-১২ কিলামিটার হাঁটা হয়। ব্যায়ামের পর প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে ছোলা (রাতে ভেজানো), বাদাম, থানকুনি পাতা, খেজুর, হরীতকী, আমলকী, কাঁচা পেঁপে, কালিজিরাসহ মৌসুমি বিভিন্ন ফল খাওয়া হয়।
সংগঠনের আরেকজন স্কোয়াড কমান্ডার পাপিয়া চাকমা পরিচালনা কমিটির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘কালমেঘ শরীরচর্চা ও মানসিক সুস্থতার একটি সংগঠন। এটি মূলত শরীরচর্চা-নির্ভর একটি সংগঠন। আমি নিজে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি ২০২০ সাল থেকে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ, সচেতন ও শৃঙ্খল জীবনযাপনের পথে পরিচালিত করে আসছে।’
কালমেঘের কয়েকজন সদস্যদের নিয়ে তিনটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো, ১. আউটরিচ কমান্ডার: যারা প্রতিদিন সকালে ফোন দিয়ে সদস্যদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। ২. লজিস্টিক কমান্ডার: যারা খাবার সরবরাহ ও সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। ৩. স্কোয়াড কমান্ডার: যারা কালমেঘের সব কার্যক্রম তদারকি করেন।
পাপিয়া চাকমা জানান, কালমেঘের মূল উদ্দেশ্য হলো- সবাইকে সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরচর্চায় অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করা, তা সংগঠনের নির্দিষ্ট স্থানে এসে হোক বা নিজ নিজ স্থানে থেকেই হোক। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের দিনে আমাদের ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থী অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছেন। যেমন- অনিয়মিত খাবার খাওয়া, রাত জেগে থাকা, ভোরে ঘুমাতে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা প্রকৃতির বিপরীত এবং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কালমেঘ এই অনিয়মিত জীবনযাপনকে একটি নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর জীবনকাঠামোতে নিয়ে আসে।
পাপিয়া চাকমা বলেন, ‘ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, দৌড়ানো, ব্যায়াম করা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কালমেঘ সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, সংগঠনটি শারীরিক স্বাস্থ্য ছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমানভাবে মনোযোগী। ব্যায়ামের শেষে যোগব্যায়াম ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে মন ও শরীর উভয়কেই প্রশান্ত রাখার চর্চা করা হয়। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে আমার মতো নারী শিক্ষার্থীদের জন্য শরীরচর্চা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে অনেক নারী শিক্ষার্থী হরমোনের সমস্যা এবং বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন, যা মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা অপরিহার্য।
২০২১ সালে ‘কালমেঘ’ সংগঠনটি ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত ১৫ দিনে ৫১২ কিলোমিটার পদযাত্রা আয়োজন করেছিল এবং পথে গাছ নিয়ে সচেতনতামূলক আয়োজন করে, যা দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছিল। এই সংগঠন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ম্যারাথন-২০২২ আয়োজন করা হয়েছিল। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তা ছাড়া সংগঠনটি প্রতিবছর ২০-৩০ রকমের দেশীয় ফল দিয়ে ফলোৎসব পালন করে।