চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) মহান বিজয় দিবসের আলোচনা সভা মঞ্চের সামনে ছাত্রদল-ছাত্র শিবির-চাকসুর নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুলতলায় এ ঘটনা ঘটে।
চবি সূত্র জানায়, ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ ডিসেম্বর। ওই দিন শহিদ বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস উপলক্ষে চবিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ড. শামীম উদ্দিন খান বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দিন নির্ধারিত ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা জীবিত না মৃত অবস্থায় ফিরবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে, এই ধারণা রীতিমতো অবান্তর।’ তার এ বক্তব্যকে ইতিহাস বিকৃতি ও শহিদ বুদ্ধিজীবীদের অবমাননা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্রদল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র কাউন্সিল ও অঙ্গনসহ ছয়টি রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন প্রতিবাদ জানায়। একই দিন রাতে তারা উপ-উপাচার্যের নিঃশর্ত ক্ষমা ও অবিলম্বে পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে।
চবি সূত্র আরও জানায়, এর পরের দিন দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করে। এতে দুই উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ভেতরে আটকা পড়েন।
এ সময় আন্দোলনকারীরা আবারও ড. শামীম উদ্দিন খানের নিঃশর্ত ক্ষমা ও পদত্যাগের দাবি জানান। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির অভিযোগ তুলে চাকসু প্রতিনিধিদের একাংশ (ছাত্র শিবিরপন্থি) আন্দোলনস্থলে আসে। এ সময় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই আলোচনার পর ছাত্রদল নেতারা জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, বিজয় দিবসের কোনো কর্মসূচিতে ড. শামীম উদ্দিন খান উপস্থিত থাকবেন না।
তবে মঙ্গবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় দিবসের প্রশাসনিক সব কর্মসূচিতে শামীম উদ্দিনের উপস্থিতি দেখা যায়। এ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর চবি প্রশাসনের উদ্যোগে জারুলতলায় ‘সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বিজয় দিবসের তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সে সভার মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শামীম উদ্দিন খান। আলোচনা সভার একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা মঞ্চের সামনে গিয়ে উপ-উপাচার্যকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার আহ্বান জানান। এ সময় তারা শামীম উদ্দিন খানের পদত্যাগ দাবি করে ‘তুই রাজাকার’, ‘একাত্তরের টিক্কা খান, পঁচিশের শামীম খান’, ‘রাজাকার আলবদর কিছুই রবে নারে’সহ বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নোমান বলেন, মহান বিজয় দিবসে কোনো রাজাকার মঞ্চে থাকতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবীদের অসম্মান ছাত্রদল ও দেশপ্রেমিক ছাত্রসমাজ কখনোই মেনে নেবে না। অবিলম্বে শামীম খানকে স্থান ত্যাগ করতে হবে; না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এ সময় মঞ্চে থাকা চাকসুর এজিএস আয়ুবুর রহমানসহ (ছাত্রদলপন্থি) হল সংসদের ৯ জন প্রতিনিধি সভা বর্জনের ঘোষণা দেন। এরপরে মঞ্চে বক্তব্য দেন চাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মো. ইব্রাহীম।
তিনি ছাত্রদলকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ে এসে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও চাকসুর একটি অংশের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবির ও চাকসুর আরেকটি অংশের নেতারা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।