নারী কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ লঙ্ঘন এই তিন মানদণ্ডে ৯৯ শতাংশ শিক্ষক-মণ্ডলী জড়িত বলে দাবি করেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকেলে নিজের ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার এ মন্তব্য করেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আম্মার ফেসবুক পোস্টে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের ক্ষমতা ও সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ম্যুরাল ও নাম পরিবর্তনের সময় শিক্ষকরা কথা না বললেও শেখ মুজিবের সময় প্রণীত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেওয়া সুবিধা ভোগ করছেন। এই অধ্যাদেশের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ও সুবিধা বাতিল করতে বললে তখন তাদের ‘আগুন লেগে যাবে’। মুজিবের ছবি রাখবেন না, নাম রাখবেন না, কিন্তু তার দেওয়া সুবিধা ভোগ করে যাবেন- এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষক’ নামক পদে বেতনভুক্ত কর্মচারীদের চরিত্র।
অধ্যাদেশের ৫৫ (২) ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি বা প্রচার চালানো, শিক্ষক সমিতিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে ব্যবহার, শিক্ষার্থী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং দলীয় স্বার্থে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলা নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এসব নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষক লঙ্ঘন করেন।’
রাকসুর জিএসের ভাষ্য, ‘ক্যাম্পাসে যে নিয়োগগুলো হয়, সেগুলো শিক্ষক নিয়োগ নয়; এগুলো ভোটার নিয়োগ। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের জন্য ভোটার তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।’
অধ্যাদেশের সেকশন ৫৫ (৩) অনুযায়ী নৈতিক স্খলন ও অদক্ষতার কারণে বরখাস্ত হবেন উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমাকে আপনারা বলেন, বুকে হাত দিয়ে ক্যাম্পাসের ১৫ শতাংশ শিক্ষকও কি দক্ষ? বা ক্যাম্পাসের নৈতিকতা নিয়ে বাঁচে কতজন? নারী কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অধ্যাদেশ লঙ্ঘন এই তিন ক্রাইটেরিয়াতেই ৯৯ শতাংশ শিক্ষক-মণ্ডলী আছেন।’
তিনি তার লেখায় রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে ‘শিক্ষাপন্থী শিক্ষক’-এর সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগ-পন্থী, বিএনপি-পন্থী বা জামায়াত-পন্থী শিক্ষক ছাড়া প্রকৃত অর্থে শিক্ষার পক্ষে থাকা শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম।
সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের দেওয়া বিবৃতির বিষয়ে তিনি লেখেন, ‘আজ শিক্ষকরা আমাকে নিয়ে বিবৃতি দিচ্ছে কেন জানেন? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন এঁদের আশ্রয়স্থল ছিল ওই আওয়ামীপন্থীরাই। দিনশেষে এরা এক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ও অযৌক্তিক সুবিধা নাকচ করে দেওয়ার মানসিকতা যেদিন দেখতে পাবেন, সেদিন তিনি ক্যাম্পাসের সবচেয়ে ভদ্র ছেলে হবেন এবং শিক্ষকদের জুতা বহন করবেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া তিনি নিজে না থাকলে অন্তত ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পরিবর্তনের দাবি যেন তোলা হয় সে কথাও বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো শিক্ষক সমাজকে নিয়ে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের এমন মন্তব্যকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ রেজা ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের ফেসবুকে লেখেন, ‘মাত্রাজ্ঞানহীন হলে যা হয়। একজন রাকসু নেতার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা, সততা ও নৈতিকতার পরীক্ষা দিতে হবে? এসব বিচার-বিবেচনা কারা করবেন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। কী শিক্ষক, কী শিক্ষার্থী কারোরই সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়।’
আদিত্য রায় রিপন নামের সাবেক এক শিক্ষার্থী লেখেন, ‘৯৯ শতাংশ অযোগ্য, নৈতিক স্খলনযুক্ত, নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয়- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। মাত্র ১ শতাংশ যোগ্য শিক্ষক দিয়ে একটা বিশ্ববিদ্যালয় রাকসুর জিএস কীভাবে চালাবে? তার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টা বন্ধ করে দিলে কেমন হয়?’
এ বি ই কাউছার নামের একজন ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামের ফেসবুক গ্রুপে মন্তব্য করেন, ‘ঢালাওভাবে এভাবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চরম অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়।’
শাকিবুল/রিফাত/