বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যারা কলমকে বেছে নেন প্রতিবাদের ও সত্যের ভাষা হিসেবে, তারাই ক্যাম্পাস সাংবাদিক। চ্যালেঞ্জ আর আনন্দের মিশেলে এই পথ যেমন কঠিন, তেমনি রয়েছে শেখার অবারিত সুযোগ। প্রতিবন্ধকতা আর সম্ভাবনার অভিজ্ঞতাকে আপন করে নিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান তাদের আগ্রহের কারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। লিখেছেন সুমন গাজী
শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার কণ্ঠস্বর
মেহরাজ হোসাইন ইমন
শিক্ষার্থী
কৃষি অনুষদ
সেশন: ২০২২-২৩
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যখন পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞানের গণ্ডি পেরিয়ে কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন, তখন তাকে চিনি ক্যাম্পাস সাংবাদিক হিসেবে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা কেবল একটি শখ বা খণ্ডকালীন পেশা নয়, মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সমাধানের মধ্যকার সেতুবন্ধ। মিডিয়া হাউসের সাংবাদিকের সঙ্গে ক্যাম্পাস সাংবাদিকের নানামুখী পার্থক্য থাকলেও দুজনের লক্ষ্য অভিন্ন, সত্যকে উপস্থাপন। সাংবাদিকতার মূল সৌন্দর্য সততা ও সাহসিকতায়। সাংবাদিক কেবল ক্যাম্পাসের ইতিবাচক সংবাদ প্রচার করে না, বরং প্রশাসনের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার কণ্ঠ হয়ে ওঠে। বাকৃবিতে সাংবাদিকতায় যুক্ত হতে নির্দিষ্ট কোনো বিভাগে পড়াশোনা করা জরুরি নয়, বরং কৃষি, ভেটেরিনারি, মৎস্য বিজ্ঞানসহ সব অনুষদের শিক্ষার্থীরাও এতে সমানভাবে অংশ নেয়। ছাত্র থাকাকালে সাংবাদিকতার হাতেখড়ির সুযোগ, যা পরে স্নাতক সম্পন্ন করে জাতীয় মিডিয়া হাউস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার পথ সুগম করে তোলে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা লিডারশিপ ও কমিউনিকেশন স্কিলে সাধারণদের থেকে অনেকাংশ এগিয়ে থাকবে।
সাংবাদিকতা হলো সমাজের দর্পণ
হুর-এ-তানহা তামান্না
শিক্ষার্থী
পশুপালন অনুষদ
সেশন: ২০২২-২৩
সাংবাদিকতা হলো সমাজের দর্পণ, যা সমাজের বাস্তব চেহারাকে তুলে ধরে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতাও তেমনি ক্যাম্পাসের বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাপ্রবাহ প্রচারের একটি মাধ্যম। ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক ঘটনা, গবেষণা, উদ্ভাবন, অগ্রগতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য একজন সাংবাদিক তার লেখনীর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমা পেরিয়ে জাতির বিবেকের কাছে তুলে ধরে। ক্যাম্পাসের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাও সাংবাদিকের দায়িত্ব। সাংবাদিকতা শুধুই সংবাদ লেখা নয়, বরং সত্যকে খুঁজে বের করা, দায়িত্ববোধ শেখানো এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো। তবে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধতাও অনেক। তা হলো সময়ের অভাব, পড়াশোনার চাপ ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি। আশা করি, এসব প্রতিবন্ধকতাই ধীরে ধীরে শেখার অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে। সর্বদা নিরপেক্ষ থেকে সত্যকে প্রকাশ করে সচেতন সাংবাদিক হতে চাই।
ক্যাম্পাস সৌন্দর্য, সাফল্য ও গৌরবের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সমস্যাগুলো সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।
ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা পেশায় না গেলেও এই অভিজ্ঞতা বিসিএস কিংবা করপোরেট জগতে এগিয়ে রাখবে।
সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদে ক্যাম্পাসকে উপস্থাপনের মাধ্যম
মোছা. মোতমাইন্না আক্তার মুন্নী
শিক্ষার্থী
পশুপালন অনুষদ
সেশন: ২০২২-২৩
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা শুধু খবর সংগ্রহের কাজ নয়, বরং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে উপস্থাপনের মাধ্যম। ক্যাম্পাসভিত্তিক সংবাদে থাকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সমস্যা, সংগ্রাম, ও সাফল্যের গল্প। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, উদ্ভাবন, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য প্রকাশের কাজ করেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। সাংবাদিকতা একজনকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়, সত্যের অবলম্বনে সাহস জোগায়, ক্যাম্পাসের চারদিকে বিদ্যমান সমস্যা সামনে আনে এবং সমাধানের পথ বাতলে দেয়। সত্যকে জানা এবং জানানোর ইচ্ছে থেকেই সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়া। এই ভাবনায় লেখালেখির চেষ্টা, সিনিয়রদের থেকে অনুপ্রেরণা আর হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা জন্ম দিচ্ছে। কারণ একটা লেখা বা প্রতিবেদন কারও চিন্তা বদলাতে পারে, বিদ্যমান সমস্যার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমাধানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো অভিজ্ঞতার অভাব এবং সময় সংকট। সময় ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে একাডেমিক পড়াশোনা এবং সাংবাদিকতার মাঝে সামঞ্জস্যতা রক্ষা করার চেষ্টা করছি।
কৃষি বিটে ভালো সাংবাদিক হওয়ার সুযোগ
মো. আবু হানিফ
শিক্ষার্থী
কৃষি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদ
সেশন: ২০২৩-২৪
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা একজন শিক্ষার্থীর জন্য ব্যতিক্রমধর্মী ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বাকৃবিতে সাংবাদিকতা করার সবচেয়ে বড় সুবিধা কৃষি বিটে বিশেষায়িত সাংবাদিক হওয়ার সুযোগ। আধুনিক বিশ্বে কৃষি আজ গবেষণায়, প্রযুক্তিতে এবং বাণিজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রাবস্থায় কৃষির উদ্ভাবন, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করলে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে দক্ষ কৃষি জার্নালিস্ট হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠানের স্বনামধন্য শিক্ষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যায়। এতে সাংবাদিকের যেমন নেটওয়ার্কিং দক্ষতা বাড়ে, তেমনি আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিজস্ব ভাবনা, বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা কেবল কলম আর কাগজে সীমাবদ্ধ নয়। এআই রিপোর্টিং, ডেটা ড্রিভেন জার্নালিজম ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীকে সময়োপযোগী করে তোলে। ক্যাম্পাসের নানা সমস্যা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাস্তবভিত্তিক চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে।