গ্রামবাংলায় কচুরিপানা চিরচেনা দৃশ্য। পুকুর, খাল বা বিল— যেদিকেই চোখ যায়, সেখানেই ভাসতে দেখা যায় কচুরিপানা। একদিকে যেমন এটি জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে, অন্যদিকে মাছচাষ ও জলজ প্রাণীর জন্য তৈরি করে বড় সমস্যা। আবার আধুনিক ফ্যাশনের জনপ্রিয় উপাদান ডেনিম বা জিন্স থেকেও প্রতিবছর তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য, যা মাটি ও পানিদূষণের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুই পরিবেশগত সমস্যাকে এক সঙ্গে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলসের (বুটেক্স) চার শিক্ষার্থী।
তাশফিক হোসাইন, অর্ণব হালদার অভি, ফারদীন বিন মনির ও অন্বয় দেবনাথ—এই চার তরুণ গবেষক কচুরিপানা ও পরিত্যক্ত ডেনিম ব্যবহার করে তৈরি করেছেন পরিবেশবান্ধব টেকসই জুতা। তাদের এই উদ্ভাবনের নাম ‘ইকো-স্টেপ’।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ল্যাবের তত্ত্বাবধানে, যেখানে সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ড. মার্জিয়া দুলাল।
অনেকে জানেন না, কচুরিপানা আসলে বাংলাদেশের দেশীয় উদ্ভিদ নয়। উনিশ শতকের শেষদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল থেকে এটি এ অঞ্চলে আসে। দ্রুত বংশবিস্তার করার ক্ষমতার কারণে এটি জলাশয়ে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ১৬ মিলিয়ন টন ডেনিম বর্জ্য জমা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
‘ইকো-স্টেপ’ জুতার ইনসোল ও ডেকোরেটিভ লেইস তৈরি করা হয়েছে শুকনো কচুরিপানার কাণ্ড দিয়ে। কচুরিপানার কাণ্ড হাতে ব্রেইড করে তৈরি করা হয় শক্ত স্ট্র্যান্ড, যা পরে বিশেষ ব্রেইডেড উইভ পদ্ধতিতে রূপ নেয় ইনসোলে। জুতার বাইরের অংশ বানানো হয়েছে ব্যবহৃত ও ফেলে দেওয়া ডেনিম কাপড় দিয়ে। কচুরিপানার উঁচু-নিচু গড়নের কারণে জুতাটি পায়ে পরলে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। এই জুতার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর পরিবেশবান্ধব গুণ। স্বাভাবিক অবস্থায় এটি ৩ থেকে ১২ মাসের মধ্যে পরিবেশে মিশে যেতে পারে। ঠিকভাবে যত্ন নিলে এক বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব, আর বিশেষ কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট দিলে এর স্থায়িত্ব বাড়িয়ে ২-৩ বছর করা যায়।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো এর খরচ। সাধারণত পরিবেশবান্ধব পণ্য মানেই বেশি দাম— এই ধারণা ভেঙে দিয়েছে ‘ইকো-স্টেপ’। এক জোড়া জুতা তৈরি করতে খরচ পড়ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব হলে এই উদ্ভাবন কচুরিপানাকে সমস্যা থেকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। একই সঙ্গে ডেনিম বর্জ্যের কার্যকর পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হবে। পরিবেশ রক্ষা, টেক্সটাইল শিল্প ও তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা—এই তিন ক্ষেত্রেই ‘ইকো-স্টেপ’ হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।