২০২৫ সালে দুর্বৃত্তের গুলিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ফের সরব হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ। বাংলাদেশে সংগঠিত এক হত্যাকাণ্ডে তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্যে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ফের সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) হাদি হত্যার বিচার দাবিতে রাজধানীতে মশাল মিছিল এবং আগামী শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। তবে ফের লাগাতার কর্মূসূচি পালন করবে কি-না, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
এর আগে বুধবার (৩ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিচারের দাবিতে দুইদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে প্লাটফর্মটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে চূড়ান্ত আন্দোলনের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য এখানে বসেছি। শহিদ ওসমান হাদির খুনকে কেন্দ্র করে দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে। আমরা চাই এ রাষ্ট্রের কুশিলবরা যাতে আলোর মুখ দেখে। এজন্য সন্ধ্যায় ইনকলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে আমরা একটি মশাল মিছিলের আয়োজন করেছি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হবে এবং শুক্রবার বাদ জুমা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছি। বাংলাদেশের সব জনগণকে শহিদ ওসমান হাদির খুনিদেরকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাদ জুমা সারাদেশে বিক্ষোভ আহ্বান করছি।’
আবদুল্লাহ আল জাবের আরও বলেন, ‘শহিদ ওসমান হাদি শুধুমাত্র একটি নাম নন বা তার খুন শুধুমাত্র বাংলাদেশের কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এ প্রশ্নে আমাদের আর ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
এর আগে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে, ভারত এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেন। এ ছাড়াও দেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও সন্দিহান তিনি। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বক্তব্য ঘিরে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সামনে আসে।
মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’-এ আয়োজিত এক বিশাল কর্মসূচি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি হত্যাকাণ্ডের আসামিরা পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই খবর সম্পূর্ণ চেপে রাখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করেছিলেন। সমাবেশে মমতা দাবি করেন, এ নিয়ে খোলাসা করে বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। যদিও তিনি তার বক্তব্যে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ করেননি।
মমতার ওই বক্তব্যে প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আজকে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট, শহিদ ওসমান হাদির খুনের সঙ্গে ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি কথা স্পষ্ট করে বলেছেন, এর (হত্যাকাণ্ড) পেছনে যারা রয়েছে; তাদের নাম প্রকাশ হলে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে, তিনি কিন্তু একটিবারের জন্যও ইন্ডিয়া উত্তাল হবার কথা বলেননি। তার মানে আমরা ধারণা করছি, বাংলাদেশের এমন কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা এ খুনের পেছনে জড়িত রয়েছে; যার নাম প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসলে, বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠবে। সে এমন ব্যক্তি হতে পারে, যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণী ঠিক করেন বা এমন সংস্থা হতে পারে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার জন্য ভারতের সঙ্গে আপস করে বসে আছে। যদি কেউ মনে করে শহিদ ওসমান হাদিকে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের বিরোধিতার কারণে হত্যা করা হয়েছে, তাহলে আপনারা ভুল করছেন।’
হাদি হত্যাকাণ্ডের পর লাগাতার কর্মসূচীতে সরব ছিল ইনকিলাব মঞ্চ। লাগাতার কর্মসূচির এক পর্যায়ে ইনকিলাব মঞ্চ দেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনেও কর্মসূচি পালন করে। দাবি ছিল, এ হত্যাকাণ্ডটি জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের। এর প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভাস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (ওএইচসিএইচআর)-এর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক নোট ভারবাল হয়। ওই নোটে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
ওই তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়ে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছিলাম যে, এই খুনের পিছনে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর পক্ষে এই খুনের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। যার কারণে আমরা যমুনায় গিয়ে বলেছিলাম যে জাতিসংঘের অধীনে আপনি একটি তদন্তের ব্যবস্থা করুন যাতে নিরপেক্ষভাবে এই খুনের পিছনে কারা রয়েছে তাদেরকে আমরা বের করে আনতে সক্ষম হই। আজকে যেহেতু প্রতীয়মান হয়েছে, এই খুনের সঙ্গে ভারত এবং ‘র’ স্পষ্টভাবে জড়িত রয়েছে তাই, সরকারকে জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের জন্য যে চিঠি পাঠানো হয়েছে; সেটির আপডেট আমাদেরকে জানাতে হবে এবং অতিদ্রুত সেই তদন্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এ ছাড়াও ওই সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টার গাফিলতির বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন।
হাদিকে বাংলাদেশের মানুষ প্রাসঙ্গিক করে তুলবে দাবি করে জাবের বলেন, ‘যারা প্রশ্ন করো ওসমান হাদির রাজনীতি কি? ওসমান হাদির রাজনীতি হচ্ছে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের স্বাধীনতা। ছাপড়ি বাহিনী ওসমান হাদিকে যতই বাংলাদেশের মাটি থেকে নাই করে দিতে চাইবে বাংলাদেশের মাটিও শহিদ ওসমান হাদিকে ততই প্রাসঙ্গিক করে তুলবে।’
এ সময় ওই সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, প্লাটফর্মটির প্রকাশনা সম্পাদক ফাহিম মীর, সদস্য হাবিবুল্লাহ মিসবাহসহ অন্যান্য নেতা-কর্মীরাও।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা শরীফ ওসমান হাদিকে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। এর তিন দিনের মাথায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
আরিফ জাওয়াদ/থিও