একসময় আকাশপথ ছিল প্রায় সম্পূর্ণ পুরুষদের দখলে। নারীদের সেখানে জায়গা পাওয়া ছিল অসম্ভবের মতোই কঠিন। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন জ্যাকি মগগ্রিজ–ব্রিটেনের প্রথম নারী বাণিজ্যিক বিমান অধিনায়ক।
জ্যাকি মগগ্রিজের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল আকাশে উড়ার। কিন্তু সেই সময় নারীদের জন্য বিমান চালনা শেখার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। ১৯৩৮ সালে তিনি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারের উইটনিতে বিমান প্রশিক্ষণ নিতে। সেখানে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী শিক্ষার্থী। এমন এক পরিবেশে, যেখানে নারীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো প্রতিনিয়ত, জ্যাকি নিজের জায়গা করে নেন আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতায়।
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। শুরুতে তিনি রাডার বিভাগে কাজ করেন, যেখানে ‘ব্যাটল অব ব্রিটেন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন। পরে তিনি যোগ দেন এয়ার ট্রান্সপোর্ট অক্সিলিয়ারিতে। এই সংস্থার হয়ে তিনি যুদ্ধবিমান এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন।
তার মেয়ে ক্যান্ডি অ্যাডকিন্সের ভাষায়, ‘তাকে যা বিমান দেওয়া হতো, তিনি তা-ই চালাতেন–ক্ষতিগ্রস্ত প্লেন, অচেনা মডেল, কঠিন আবহাওয়া–সবকিছুতেই তিনি ছিলেন নির্ভীক।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জ্যাকি ১ হাজার ৪৩৮টি বিমান উড়িয়েছিলেন এবং ৮৩ ধরনের যুদ্ধবিমানে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। একা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করেও তিনি কখনো পিছিয়ে যাননি।
তবে যুদ্ধ শেষে নারীদের জন্য বাস্তবতা বদলায়নি। বরং আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক নারী পাইলটকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং অধিকাংশই আর কখনো বিমান চালানোর সুযোগ পাননি। জ্যাকিও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
সেই সময় প্রায় কোনো বিমান সংস্থাই নারীকে পাইলট হিসেবে নিয়োগ দিত না। কিন্তু ব্যতিক্রম হয়ে আসে ‘চ্যানেল এয়ারওয়েজ’। তারা জ্যাকিকে যাত্রীবাহী বিমানের দায়িত্ব দেয়–পোর্টসমাউথ ও সাউদাম্পটন থেকে গার্নসি, জার্সি এবং আইল অব ওয়াইট পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ।
এই সুযোগই তাকে এনে দেয় ইতিহাসের সেই গৌরবময় পরিচয়–ব্রিটেনের প্রথম নারী বাণিজ্যিক বিমান অধিনায়ক। তার মেয়ে বলেন, “এই কাজটি নিয়ে মা ভীষণ গর্বিত ছিলেন। গার্নসিতে উড়ান পরিচালনাই তাকে ‘ক্যাপ্টেন’ উপাধি এনে দেয়।”
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি যাত্রীরা ভয় পেতে পারেন–এই অজুহাতে তাকে বিমানের ইন্টারকমে কথা বলতে দেওয়া হতো না। অর্থাৎ তিনি বিমান চালাচ্ছেন, কিন্তু যাত্রীরা জানতেই পারছেন না–এই বিমানের পাইলট একজন নারী!
এই বৈষম্যের মধ্যেও জ্যাকি নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে। গার্নসিতে কাজ করার সময় তিনি দ্বীপটির মানুষ ও পরিবেশকে ভালোবেসে ফেলেন। সেখানে থাকা অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কবিতাও লিখেছেন। এমনকি একসময় নিজের পরিবারকেও তিনি বিমানে করে সেখানে ঘুরতে নিয়ে যান–যা তার মেয়ের স্মৃতিতে আজও অমলিন।
জ্যাকির জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল–তিনি কখনো ভাবেননি যে নারী হওয়াটা কোনো বাধা হতে পারে। তার মেয়ে বলেন, ‘মা কখনোই বুঝতে পারতেন না, কেন একজন নারী উড়তে পারবে না–এটা ভাবা হয়।’
২০০৪ সালে জ্যাকি মগগ্রিজ মারা যান। তবে তার গল্প থেমে যায়নি। তার মেয়ে ক্যান্ডি অ্যাডকিন্স আজও বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দিয়ে মায়ের গল্প তুলে ধরেন, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন।
/এসএল
.jpg)