উচ্চস্বরে বলা হচ্ছিল ‘ধাক্কা দেও... ডুবাও’! এ রকম এক নির্দেশের সুর শোনার পরই ইঞ্জিন নৌকাটি সজোরে ধাক্কা দেয়। মাঝ নদে ডুবে যায় বারকি নৌকা। এরপর হই হট্টগোলের মধ্যে তিনজন বারকি শ্রমিককে দেখা গেল সাঁতার কেটে তীরে উঠতে।
এমন চিত্র দেখা গেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনওকে বহনকারী একটি ইঞ্জিন নৌকা ধাক্কা দিয়ে বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেয়।
জানা যায়, ধলাই নদের উৎসমুখে পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া পর্যটন এলাকার পাথর চুরি ঠেকাতে এ রকম এক কৌশল নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ধলাই নদে বারকি নৌকা চললেই ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ কাজটি যারা করছেন, তারা ‘বারকি চললেই ডুবাও’ বলে প্রচারও করছেন। বন্যার মধ্যে এমন কাণ্ডে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও ইউএনওর দাবি, ঘটনাটি দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে উদ্ধার বা এ ঘটনার দায় নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবাহমান ধলাই নদ সিলেটের একটি বড় সীমান্ত নদ। ধলাই নদের উৎসমুখে পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর। নদের এক পাশে বৃহত্তম বালু ও পাথর মহাল ভোলাগঞ্জ। মহালের বালু-পাথর বহনে ধলাই নদে চলে অন্তত ৫০ হাজার বারকি নৌকা। মালবাহী এসব নৌকার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করে লক্ষাধিক বারকি শ্রমিক। পাথর মহাল বন্ধ থাকায় বারকি নৌকা চলাচল কমে গেলেও ‘বারকি চললেই ডুবাও’ ফরমানে মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন বারকি শ্রমিকরা।
ধলাই নদে পাহাড়ি ঢল নামলেই জলজীবিকার বাহন হিসেবে বারকি চলাচল শুরু হয়। বর্ষা মৌসুমে একটি বারকি নৌকায় অন্তত চারজন শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয়। পাথর ছাড়াও বালু বা ভারী বাহন জলপথে বহনের জন্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত নৌকাটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। সিলেট অঞ্চলের সব সীমান্ত নদ-নদী দিয়ে চলাচল করে বারকি নৌকা। প্রায় দুই-তিন দিনে বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এতে করে বারকি শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে ধলাই নদ তীরের দয়ারবাজার এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনজিত কুমার চন্দের নির্দেশে দুটো বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যাকবলিত হওয়ার মধ্যে এ রকম কাণ্ডকে অমানবিক বলে মন্তব্য করছেন অনেকে। সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ফেসবুকে গণমাধ্যমকর্মী আবুল হোসেনের পেইজে এ রকম একটি ভিডিও দেখা গেছে।
এ বিষয়ে আবুল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাহাড়ি ঢল নামায় ধলাই নদের চারপাশ বন্যাকবলিত। বারকি নৌকা দিয়ে মানুষজন আক্রান্ত এলাকা থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় ঘটনাটি বারকি শ্রমিক ছাড়াও সাধারণ মানুষজনকে ক্ষুব্ধ করেছে। বন্যাকবলিত হওয়ার সময়ে ইউএনওর এমন ফরমান চরম অমানবিক।’
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে অনেকেই ঘটনাটি অমানবিক, দুঃখজনক মন্তব্য করে ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মোস্তাফিজুর রহমান নামের একজনের মন্তব্য, ‘মানুষ কী পরিমাণ নিরুপায় অইলে ইলা অবস্থায় যায়? পাথর অইল আমরার সম্পদ, এখানে গরিবের হক সবচেয়ে বেশি।’ মো. সাদিকুল বলেছেন, ‘পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর হাজার কোটি টাকা সম্পদের পাহাড় গড়ে, আর সাধারণ শ্রমিক এক পাথর আনার জন্য পেটে লাথি।’ জামাল হোসেন লিখেছেন, ‘মানুষ কতটা অসহায় আর নিরুপায় হলে জীবনকে তুচ্ছ করে ভয়াবহ স্রোতের মধ্যেও সংগ্রাম করতে পারে!’ আব্দুল কুদ্দুছ খন্দকার লিখেছেন, ‘পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিকরা কী করুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, প্রকৃত মানুষ ছাড়া কেউ বুঝবে না। মানুষ মানুষের জন্য, তাদের নৌকায় উঠানো উচিত ছিল।’ রিয়াজুল ইসলাম খোকন নামের একজন বলেছেন, ‘একজন নির্বাহী কর্মকর্তা হয়ে কী করে পারেন এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে?’ ইশহাক আহমদ বলেছেন, ‘অপরাধ করলে শাস্তি দেবেন, কিন্তু সবার নৌকা ডুবিয়ে দেবেন কেন?’
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধলাই নদ উপচে উঠেছে। উপজেলা পরিষদ মাঠ, থানা রোড ও থানা কম্পাউন্ড জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ধলাই নদের পানি উপচে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে উপজেলা প্রশাসন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনজিত কুমার চন্দ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদের পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং পর্যটনকেন্দ্রসমূহ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাদাপাথর পর্যটন ঘাটসহ সকল পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হলো।’
বন্যার মধ্যে ‘বারকি নৌকা ডুবাও’ ফরমান হিসেবে প্রচার চালানো ও গত বৃহস্পতিবার বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে জানতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে যোগাযোগ করলে কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও সুনজিত কুমার চন্দ দাবি করেন, ‘বারকি ডুবাও এ রকমের কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি।’ তাহলে কী ঘটেছিল? এ প্রশ্নে ইউএনও খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাহাড়ি ঢল নামায় সাদাপাথর এলাকায় পাথর চুরির খবর পাওয়া গেছে। সেই স্থানটি পরিদর্শন করে ফেরার পথে আমাদের নৌকার সঙ্গে বারকি নৌকার ধাক্কা লেগেছিল।’
‘বারকি চললেই ডুবাও’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রচারণার বিষয়টিও ইউএনও ‘না- এ রকম কিছু না’ বলে এড়িয়ে যান।
ইউএনও এড়িয়ে গেলেও ঘটনার আরও কিছু ভিডিওচিত্র এলাকাবাসীর কাছে সংরক্ষিত আছে বলে জানিয়েছেন বারকি শ্রমিকরা। ইউএনওর ইঞ্জিন নৌকার ধাক্কায় ডুবে যাওয়া দুটো বারকি নৌকার তিনজন শ্রমিকের বাড়ি ধলাই নদ তীরের কলাবাড়ি এলাকায়। সেখানকার বারকি শ্রমিক সংগঠনের দুজন নেতা জানিয়েছেন, তারা ডুবে যাওয়া বারকি নৌকা উদ্ধার করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।