বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় গেরুয়া রঙের বস্ত্রকে বলা হয় চীবর। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা তৈরি করে তাঁতে বানানো বস্ত্র দান করা হয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। কঠোর নিয়ম মেনে চীবর তৈরির এ কাজটি বেশ কঠিন বলেই এর নামকরণ হয়েছে কঠিন চীবর দান। গৌতম বুদ্ধের সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা বানিয়ে চীবর তৈরি করে বুদ্ধ ও শিষ্যসংঘকে দান করেন গৌতম বুদ্ধের প্রধান উপাসিকা পুণ্যবতী বিশাখা। তারই পরম্পরায় ২ হাজার ৫৬৭ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আসছে এই কঠিন চীবর দানোৎসব।
বাংলাদেশে প্রথম ১৯৭২ সালে রাঙামাটির লংগদুতে কঠিন চীবর দানোৎসবের সূচনা করেন রাজবন বিহারের প্রধান পরিনির্বাপিত বনভান্তে। এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পার্বত্যাঞ্চলে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ রীতিতে চীবর দান করছেন পাহাড়ের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। আর ১৯৭৫ সাল থেকে রাঙামাটি রাজবন বিহারকে কেন্দ্র করে উৎসবটি একটানা চলছে। মাঝে কেবল ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে দুই বছর বন্ধ ছিল। বৌদ্ধদের বিশ্বাস কঠিন চীবর দানের কারণে সুখ-শান্তি অর্জনের পাশাপাশি পরবর্তী জন্মে সুখ লাভ করা যায়। মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রি-চীবর নামে চার খণ্ডের বিশেষ পরিধেয় বস্ত্র দান করা হয়। যাতে রয়েছে চীবর, দোয়াজিক, অন্তর্বাস ও কটিবন্ধনী।
তবে সম্প্রতি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পাহাড়ি বাঙালি সহিংসতার জেরে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাহীনতা’র অভিযোগ তুলে পার্বত্য তিন জেলায় এবারই প্রথম কঠিন চীবর দান উদযাপন না করার ঘোষণা দিয়েছেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত ভিক্ষু সংঘ’। ৬ অক্টোবর রাঙামাটি মৈত্রী বিহারে সংবাদ সম্মেলন করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত ভিক্ষু সংঘের সভাপতি ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের এই ঘোষণা দেন। ফলে আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য পালনে অপেক্ষায় থাকা লাখো পুণ্যার্থী পার্বত্যাঞ্চলে কঠিন চীবর দানোৎসব নিয়ে পড়েছেন শঙ্কায়। অবশ্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ভিক্ষুসংঘের সঙ্গে বিষয়টি সমাধানের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাঙামাটি সদর উপজেলা বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অমর চাকমা বলেন, ‘সহিংসতার পরে এই যে সন্দেহ, অবিশ্বাসের কারণেই এবার কঠিন চীবর দানোৎসব হচ্ছে না। জেলা প্রশাসক ভিক্ষুসংঘের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ভিক্ষুসংঘের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
রাঙামাটি জেলা বিএনপি সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর সময়ে পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিচার না হওয়া আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা প্রশাসনকে অনুরোধ করব, দ্রুততম সময়ে এ বিষয়গুলো সমাধান করা হোক, যাতে চীবরদানটা আমরা যেন সুন্দরভাবে উদযাপন করতে পারি। এই আহ্বানটুকু সবার কাছে রাখছি।’
রাঙামাটির পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘কঠিন চীবর দানোৎসবে এবার আরও শক্তিশালী ও আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাঙামাটিতে নিরাপত্তাহীনতার কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের পাশাপাশি র্যাব মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হবে।’
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান বলেন, ‘পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। আমরা ভিক্ষু সংঘের ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছি। তারা সময় নিয়েছেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য।’
বনভান্তের ভিক্ষুসংঘ অবস্থান করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন শতাধিক বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসব হয়। আয়োজক ও পুণ্যার্থীরাও এই দানোৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। এ সময় স্থানীয়দের দানের অর্থে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে ব্যাপক সাজসজ্জা আর আনুষ্ঠানিকতায় ৫ থেকে ২০ লাখ বা তারও বেশি টাকা ব্যয় হয়। এই আয়োজনে নানান সাজসজ্জা, চীবরদান, ধর্মসভা, বুদ্ধমূর্তিদান, হাজার প্রদীপদান, কল্পতরুদান, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, খাবার আর নতুন পোশাকের পেছনে প্রায় প্রতিদিনই ব্যয় হয় লাখ লাখ টাকা।
আষাঢ়ি পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধ ভিক্ষুরা একটি নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাসের বর্ষাবাস সম্পন্ন করেন। এরপর কঠিন চীবর দানের মাধ্যমে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন ভিক্ষুরা। এ সময় আশ্বিনী পূর্ণিমা থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত মাসব্যাপী সারা দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পালন করেন কঠিন চীবর দানোৎসব। এ বছর ১৭ অক্টোবর শুরু হচ্ছে প্রবারণা পূর্ণিমা।
মাসব্যাপী চলা দেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দানোৎসবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উৎসবের জনপদে পরিণত হয়। শতাধিক বৌদ্ধবিহারকে কেন্দ্র করে উৎসব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
পাহাড়ি পল্লিগুলোয় চলে উৎসবের আমেজ। এককভাবে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় ধর্মানুষ্ঠান ‘কঠিন চীবর দানোৎসব’ আয়োজন হয় রাঙামাটির রাজবন বিহারে। প্রতি বছর এ অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে। বিশাল এই আয়োজনে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য উৎসব এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।