খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দিয়েছেন মনিকা চাকমা। নেপালের দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে পরাজিত করে বাংলাদেশ নারী দল টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় উৎসবে মেতে উঠেছে মনিকার গ্রাম খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সুমন্তপাড়া। শিরোপা জয়ের পর থেকে গোটা এলাকাবাসী মনিকার বাড়িতে ভিড় করছেন, এলাকাবাসীকে মিষ্টি খাইয়েছেন তার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা ও মা রবিমালা চাকমা।
ছোটবেলা থেকেই মনিকার ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছিল। বাবা-মার বাধা সত্ত্বেও বড় বোনের সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুটবল খেলতেন। ২০১৯ সালে বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ নারী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে করা একটি গোলে ফিফা তাকে ‘ম্যাজিকেল মনিকা’ উপাধি পান।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই মনিকার ফুটবল জীবন নতুন মাত্রা পায়। পরে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় পর্যায়ে খেলার ডাক পান এবং ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এএফসি টুর্নামেন্টে দেশের হয়ে তিনটি গোল করে দেশকে তৃতীয় স্থান ও ফেয়ার প্লে ট্রফি এনে দেন। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সাফ শিরোপা জয়ের পর এবার আবারও বাংলাদেশ নারী দলকে শিরোপা এনে দিয়ে মনিকা দেশের গর্ব হয়ে উঠেছেন। তার এই সাফল্যে গোটা দেশের পাশাপাশি তার গ্রামেও আনন্দের জোয়ার বইছে। মনিকার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন সবাই মেয়ের এই অর্জনের জন্য গর্বিত।
তবে পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। পরিবারের সবচেয়ে ছোট মেয়ে মনিকা চাকমা ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কৃষক পরিবারে জন্ম। মনিকা চাকমা ছোটবেলায় বেড়ে উঠেন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দুর্গম লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ সুমন্তপাড়ায়। উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় তার গ্রামে। মনিকার ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছিল বেশ। তবে তার বাবা চাইতেন না সে ফুটবল খেলুক। তাই বাবাকে ফাঁকি দিয়েই ফুটবল খেলতেন মনিকা। তবে তার সঙ্গী ছিলেন বড় বোন অনিকা চাকমা। তবে কে জানত মনিকা চাকমাই একদিন পুরো দেশ মাতাবেন। অবদান রাখবেন দেশের ফুটবল অঙ্গনে। তবে তার শিক্ষক বীরসেন চাকমা ও গোপাল দে ছিল ম্যাজিকেল মনিকা হিসেবে বেড়ে উঠার পেছনের কারিগর।
মনিকা চাকমার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা বলেন, ‘একটা সময় আমি চাইতাম না মনিকা ফুটবল খেলুক। কিন্তু এখন আমি আমার মেয়ের সাফল্যে গর্বিত ও আনন্দিত। সে শুধু আমার পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেনি, দেশকেও গৌরবান্বিত করেছে। বাসা থেকে বের হলে সবাই সম্মান করে পরিবার ও মনিকার খোঁজখবর নিচ্ছে। এর চেয়ে গর্বের কী হতে পারে?’
মনিকার মা রবিবালা বলেন, ‘শিরোপা জেতায় খুব ভালো লাগছে। আর এ ম্যাচে আমার মেয়ে মনিকা একটি গোলও করেছে। খেলায় জেতার পর পাড়াবাসীকে মিষ্টি ও বিস্কুট খাইয়েছি।’
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছেনমং রাখাইন জানান, উপজেলায় তার আসাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে।