চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তত্ত্বাবধানে ‘চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বেদখল হয়ে গেছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা। কিডস জোন, খোলা জায়গা, পর্যটকদের বসার ব্লক, ফুলের বাগান- সব জায়গায় দোকান বসানো হয়েছে।
ভেঙে গেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সড়কবাতিগুলো। এখন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন করে আরও ৩১টি দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন রিং রোডের সৌন্দর্য ঢাকা পড়ছে দোকানের আগ্রাসনে। এ যেন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য গড়ার আগেই ভেঙে ফেলার খেলা!
সিডিএ বলছে, বেদখল এবং সড়কবাতি নষ্ট হওয়ার জন্য সৈকতের অবৈধ দোকানিরা দায়ী। তারাই বাতিগুলো ভেঙেছেন। ফুলের বাগান নষ্ট করেছেন।
সিডিএ সূত্র জানায়, ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় চট্টগ্রাম আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এই প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। জুন ২০২৪ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২ হাজার ৮০৮ দশমিক ৭৬ কোটি টাকা (৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ) ও ভৌত অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ। সংস্থাটি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে লাগানো সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিট লাইটগুলো মরিচা ধরে ভেঙে পড়েছে। বেশির ভাগ স্ট্রিট লাইটের শুধু খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কোনো বাতি নেই। এতে সন্ধ্যার পর সৈকত এলাকায় ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। সৈকতের একাধিক হকার জানান, বাতিগুলো অনেক দিন ধরেই নষ্ট। এ কারণে সন্ধ্যার পর সৈকত এলাকায় অপরাধ বেড়ে যায়।
এ ছাড়া সৈকতের বাগান, কিডস জোন, ওয়াকওয়ে এবং পর্যটকদের বসার জায়গা- সবকিছু বেদখল হয়ে গেছে। ফুলের বাগান নষ্ট করে বসানো হয়েছে দোকান। কেউ বসিয়েছে নাগরদোলাসহ শিশুদের বিভিন্ন ধরনের রাইড। নেভালের পাশে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সৈকতে আর নির্বিঘ্নে হাঁটার সুযোগ নেই।
যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা। হকার এবং ফটোগ্রাফারদের উৎপাত। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা প্রশাসনের তৎকালীন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাদের অবৈধভাবে সৈকতে দোকান বসানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
ওই কর্মকর্তা বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ টাকা চাঁদাও উঠছে। যা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাঁটোয়ারা হয়।
সৈকতে ঘুরতে আসা ২০ জন পর্যটকের সঙ্গে কথা হয়েছে খবরের কাগজের প্রতিবেদকের। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতির কারণে সবাই বিরক্ত প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন করেছে। নির্মল পরিবেশে পর্যটকদের বসার এবং হাঁটার জায়গা করে দিয়েছে।
শিশুদের ছোটাছুটি করার জন্য খোলা জায়গা করে দিয়েছে। এখন সব জায়গায় দোকান আর দোকান। কোথাও পা ফেলার বা বসার সুযোগ নেই। এসব দোকান থেকে সর্বত্র আবর্জনা ফেলে আবর্জনার গন্ধযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যা একটি পর্যটন এলাকার সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না।
এদিকে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ৩১টি দোকান বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট না করেই আমরা দোকান দেব। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের দোকান দেওয়া হবে।’ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে কীভাবে দোকান দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, সিডিএ তাদের কাজ করছে।
জেলা প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে সেখানে পার্কিং নির্মাণসহ বেশকিছু উন্নয়ন কাজ করবে। দোকান বরাদ্দ দিতে আইনগত বাধা নেই বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, সৈকতের উন্মুক্ত জায়গা কিংবা পর্যটকদের বসার ব্লকে কোনো দোকান থাকতে পারবে না।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ওয়াহিদুল আলম মাস্টার খবরের কাগজকে বলেন, সৈকতের চার স্তরের উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রথম স্তর হলো সড়ক, দ্বিতীয় স্তর কিডস জোন। তৃতীয় স্তরে করা হয়েছে বাগান এবং চতুর্থ স্তরে রাখা হয়েছে ওয়াকওয়ে।
তিনি জানান, বিচ উন্নয়নের সময় যারা পুরোনো ব্যবসায়ী ছিলেন তাদের বিচের বাইরে একপাশে দোকান বসানোর জায়গা করে দেন সিডিএ চেয়ারম্যান এবং পুলিশ কমিশনার।
অথচ তাদের পুনর্বাসন করার কথা ছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মো. ফখরুজ্জামান পরিদর্শন করে কিছু ব্যক্তিকে মৌখিকভাবে বিচের বাগান এবং বসার জায়গা নষ্ট করে দোকান নির্মাণ করার মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন বলে শুনেছি। এরপর দেখি বিচে পর্যটকদের বসার জায়গা, কিডস, জোন এবং ফুলের বাগান নষ্ট করে অবৈধভাবে দোকান বসানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস খবরের কাগজকে বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো সংস্থা সেখানে কিছু করতে পারে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন জেলা প্রশাসন সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দোকান বসানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। সৈকতে যেসব দোকান বসানো হয়েছে সবগুলো অবৈধ।