চট্টগ্রাম মহানগরে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত কোনো পার্ক চালু নেই। ৫ আগস্টের আগে দুটি পার্ক খোলা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। সচেতন মহল বলছে, শিশুদের বিনোদনের জন্য যে কয়টি পার্ক আগে চালু ছিল, সেগুলো দ্রুত খুলে দেওয়া হোক। যদিও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৬ সালে নগরের বহদ্দারহাটে ১৬.১৭ একর জমির ওপর একটি পার্ক গড়ে তোলা হয়। শুরুতে এটির নাম ছিল ‘জিয়া স্বাধীনতা পার্ক’। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নাম বদলে ‘স্বাধীনতা পার্ক’ করা হয়। চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই হেলাল উদ্দিন এটির ইজারাদার ছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর মহিউদ্দিন বাচ্চু পালিয়ে যায়। ওই দিন পার্কটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। সেই থেকে পার্কটি বন্ধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন এখানে গড়ে ৫০০ দর্শনার্থী ঘুরতে আসতেন। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ছিল ১০০ টাকা, শিশুদের জন্য ছিল ৮০ টাকা। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পার্কটি খোলা থাকত।
এখানে শিশুদের জন্য কয়েকটি রাইড আছে। এ ছাড়া বহুতল ওয়াচ টাওয়ার, দৃষ্টিনন্দন বসার জায়গা, রেস্তোরাঁ, ফুড কোট, কৃত্রিম লেক, বাগান, ভাস্কর্য, জাঁকজমকপূর্ণ লাইটিং, সংসদ ভবনের ডামি, স্মৃতিসৌধসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। মিনি বাংলাদেশ খ্যাত এই পার্ক বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এদিকে নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ২০০০ সালে ৯ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় কর্ণফুলী শিশু পার্ক। এটির নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ৫ আগস্টের পর থেকে এটিও বন্ধ রয়েছে। এখানেও দৈনিক ১০০-১৫০ জন দর্শনার্থী ঘুরতে আসতেন। এখানে আছে লেক ভিউ চাইনিজ রেস্তোরাঁ, রাইডসহ আরও নানা স্থাপনা। ৪০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে কর্ণফুলী শিশু পার্কে বিনোদন নিত শিশুরা।
নগরের আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা আবছার উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সবার মুখে একটি প্রশ্ন, শিশুরা এখন যাবে কোথায়? শহরে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ নেই, নেই কোনো পার্কও। পার্ক থাকলেও সেখানকার পরিবেশ শিশুদের উপযোগী নয়। পার্কগুলো থাকে বৃদ্ধদের দখলে। এমন অবস্থার পরিবর্তন দরকার।’
শিশুদের নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী আরাফাত এলাহী মনে করেন, ‘বিনোদনকেন্দ্রগুলো শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার। মালিক যেই হোক না কেন এগুলো বন্ধ থাকা কাম্য নয়। সরকার চাইলে কোনো প্রশাসক দিয়ে এগুলো পরিচালনা করতে পারে।’
চট্টগ্রাম শিশু একাডেমির জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা মোসলেহ উদ্দিন বলেন, শহরের শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য পার্কের কোনো বিকল্প নেই। চট্টগ্রামের সব পার্ক শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করা হোক।
জানা গেছে, স্বাধীনতা পার্ক, কর্ণফুলী শিশু পার্ক ছাড়াও নগরের কাজির দেউড়িতে আরও একটি শিশু পার্ক ছিল। ১৯৯২ সালে তিন একর জমিতে এটি গড়ে তোলা হয়। ওই সময় সিটি করপোরেশনকে এটি গড়ে তুলতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনাপত্তি দেয়। ২৫ বছরের জন্য প্রথমবার এটি ইজারা নেয় মিডিয়া বিজনেস সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
২০১৯ সালে ইজারার মেয়াদ শেষ হয়। ২০২০ সালে একই প্রতিষ্ঠান আবারও ১৫ বছরের জন্য চসিক থেকে এটি ইজারা নেয়। কিন্তু অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ উঠায় নানা মহল থেকে এটি ভেঙে দিয়ে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও উন্মুক্ত চত্বর গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়। একপর্যায়ে ২০২৩ সালে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে জেলা প্রশাসনের অভিযানে এটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে মহানগরের বহদ্দারহাটের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স ও জিয়া জাদুঘরের সামনের সার্কিট হাউসসংলগ্ন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি (পূর্বের শিশু পার্ক) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) বরাদ্দ দিতে চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০ নভেম্বর তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পৃথক দুটি চিঠি পাঠান।
এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নাগরিকদের অবসরে সুস্থ বিনোদনের জন্য নগরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক নেই। বহদ্দারহাটের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স ও কাজির দেউড়ী শিশু পার্ক (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি) সিটি করপোরেশনকে ইজারা দিলে সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘এর আগেও পার্কগুলো চসিকের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের অতিমুনাফা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেখান থেকে নাগরিকদের চিত্ত বিনোদনের বিষয়টি হারিয়ে যায়।’