প্রায় বছর তিনেক আগেও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের সবচেয়ে আরামদায়ক ও নিরাপদ মাধ্যম ছিল লঞ্চ। এজন্য ২০২২ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত কেবিন নামক ‘সোনার হরিণের’ টিকিটের জন্য মালিকদের কাছে সুপারিশ আসতো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে।
দুই ঈদের ছুটির এক মাস আগেই বুকিং হয়ে যেত লঞ্চের কেবিনগুলো। প্রায় তিন বছর ধরে সেই চিত্র নেই বরিশালের লঞ্চ কাউন্টারগুলোতে। ১৬টির জায়গায় দুই প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ৪টি লঞ্চ চলাচল করলেও তার প্রায় ৭০ শতাংশ কেবিন যাচ্ছে ফাঁকা। পাশাপাশি ডেকের যাত্রী সংখ্যা কমেছে ৬৫ শতাংশ।
বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগ জানিয়েছে, কেবিন ও ডেক মিলে লঞ্চের ৬৬ শতাংশ যাত্রী কমেছে। ফলে এই ব্যবসায় ধস নেমেছে। তাই মালিকরাও ব্যবসার ধরন বদলানোর চিন্তা করছেন। এ ছাড়া পেশার পরিবর্তন করেছেন লঞ্চকেন্দ্রিক নৌবন্দর এলাকায় গড়ে ওঠা অধিকাংশ মানুষ।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে চরম আকারে যাত্রীসংকট দেখা দিয়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে দুই প্রান্ত (ঢাকা সদরঘাট ও বরিশাল নৌবন্দর) থেকে ১৬টি লঞ্চ চলাচল করত। বর্তমানে মাত্র ৪টি লঞ্চ চলাচল করছে। রোটেশন ভিত্তিতে চলাচল করায় প্রতি সপ্তাহে আপডাউন একটি ট্রিপ পাচ্ছে লঞ্চগুলো।
এতে ঠিকমতো যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে লাভ তো দূরের কথা, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। শুধু লঞ্চ মালিকরা নয়, ছেদ পড়েছে নৌযান শ্রমিক ও বরিশাল নৌবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, কুলি-মজুরদের মাঝেও। তাদের কেউ জায়গা বদল করেছেন, কেউবা বদলেছেন পেশা। লঞ্চে যাত্রী না থাকায় কাজ হারিয়েছেন অনেক শ্রমিক।
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে প্রতি দিন ঢাকা থেকে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ লঞ্চে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আসা-যাওয়া করতেন। আর ঈদের সময় সেই সংখ্যা প্রায় কোটিতে গিয়ে ঠেকত। সেখানে এখন যাত্রী ৪ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্য ও সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক সাইফুর রহমান পিন্টু বলেন, ‘ব্যবসা তো আর নেই। যাত্রী এখন ৪ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে। এ থেকে উত্তরণের রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছি না। একটি লঞ্চ চালিয়ে আপডাউনে যে পরিমাণ তেল খরচ হয়, সেটার টাকাও উঠে না। এরপরে আছে স্টাফসহ অন্যান্য খরচ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই রুটে প্রতিদিন আমাদের ৪টা লঞ্চ চলাচল করত। এ ছাড়া পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি রুটে ২টি করে আরও ৬টি লঞ্চ চলত। যাত্রীসংকটের কারণে শুধু ঢাকা-বরিশাল রুটে ২টি লঞ্চ চলাচল করছে। রোটেশন পদ্ধতিতে সপ্তাহে একটি আপডাউন ট্রিপ পাচ্ছি। অন্য দুই রুট বন্ধ হয়ে গেছে। এই রুটে আর যাত্রী ফেরানো সম্ভব নয়। এখন ভাবছি, লঞ্চগুলো কেটে প্রমোদতরি করা যায় কি না।’
সুরভি গ্রুপের পরিচালক রিয়াজ উল কবির বলেন, ‘নৌযাত্রা হলো আমাদের শতবর্ষের ট্রেডিশনাল বিষয়। এটাকে টিকিয়ে রাখা উচিত। এটা এখন টিকিয়ে রাখতে শুধু ঢাকা-বরিশাল রুট নয় বরং বিভিন্ন রুটে ক্রুজ আকারে লঞ্চগুলো ব্যবহার করতে পারি।’
বরিশাল লঞ্চ ঘাটের শ্রমিক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালকেন্দ্রিক প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ছিন্নমূল মানুষ কুলির কাজ করত। লঞ্চে যাত্রী না থাকায় ঘাটে এখন ৫০ জন কুলিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা কুলির কাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। আবার অনেকেই অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছে।’
বরিশাল নৌবন্দর এলাকার ফল বিক্রেতা ইয়াছিন শরীফ বলেন, ‘করোনার সময়ে বেশ কয়েক মাস লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শুরু করছিলাম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকে ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রী একেবারেই কমে গেছে। লঞ্চকে কেন্দ্র করে ফুটপাতে যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা করতাম তাদের ব্যবসায়ও ধস নামায় অনেক টাকা লোকসান দিয়েছি। বর্তমানে ভ্যানে করে লেচু শাহ্ মাজার এলাকায় ফল বিক্রি করছি। এ দিয়ে দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়।’
টার্মিনালে সংবাদপত্র বিক্রেতা মো. মাজাহারুল ইসলাম বাদল বলেন, ‘আগে শুধু লঞ্চযাত্রীদের কাছেই প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই শ পত্রিকা বিক্রি করতাম। এখন সারা দিনে ২৫-৩০ কপি পত্রিকাও বিক্রি হয় না।
সুন্দরবন লঞ্চের স্টাফ হারুনুর রসিদ বলেন, ‘অনেক দিন ধরে একই বেতনে কাজ করছি। আমাদের বেতন বাড়ার কথা ছিল। পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাত্রী কমে গেছে। এখন তো আর বেতন বাড়ার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় কোম্পানির কেবিন না পেয়ে যাত্রীরা স্টাফ কেবিনগুলো ভাড়া নিতেন। ওই সময়ে তা ভাড়া দিয়ে দৈনিক গড়ে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করতাম। এখন অধিকাংশ কোম্পানির কেবিনই খালি থাকে। স্টাফ কেবিন ভাড়া হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।’
বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘লঞ্চের যাত্রীসংকটে বর্তমানে আমাদের রাজস্ব আয় ৬৬ শতাংশ কমে গেছে। লঞ্চে যাত্রী ফেরানোর চেষ্টা করছি। তাতে কতটুকু লাভবান হব, তা বলা যাচ্ছে না। তবে যাত্রীরা সময়ের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলে লঞ্চে যাত্রী বাড়বে।’ তিনি জানান, গত ২০ বছরে বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে ২৬টি বিলাসবহুল লঞ্চ নামানো হয়। এর বেশির ভাগ এখন অচল রাখা হয়েছে।