নানা অভিযোগের ভিত্তিতে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দল। বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের গোপালগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে দুদকের একটি দল হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়।
জানা গেছে, গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গোপালগঞ্জ জেলা ছাড়াও বাগেরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর, নড়াইল জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা সেবা নেন। হাসপাতালের ধারণ ক্ষমতার থেকে কয়েকগুণ বেশি রোগী আসে এ হাসপাতালে। ফলে এ হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠেছে সার্টিফেকেট ও প্রাইভেট ক্লিনিক বাণিজ্য। ডাক্তারদের সকাল ৯টায় হাসপাতালে আসার কথা থাকলেও অনেক ডাক্তার আসেন বেলা ১১টা বা ১২টার দিকে। এতে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। এছাড়া ১০ টাকার টিকিটের স্থলে নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা, ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে সার্টিফেকেট। এক্সরে মেশিন, সিটিস্ক্যান মেশিন, এমআরআই নষ্ট থাকায় ডাক্তারদের পছন্দমতো ক্লিনিকে পরীক্ষা করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে কমিশন পাচ্ছেন ডাক্তাররা। আর এসব রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে নিতে হাসপাতালে গড়ে ওঠেছে সিন্ডিকেটের পাশাপাশি দালাল চক্র।
এদিকে দীর্ঘ দিন ধরে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার ফারুক আহম্মেদ, ওয়ার্ড বয় মো. সোহেল শেখ ও অফিস সহায়ক কুদ্দুস গাজীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এনিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া ছাড়াও ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে হাসপাতালে চলছে রমরমা সার্টিফেকেট বাণিজ্য। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুদকের অভিযানে সার্টিফিকেটের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন, সময়মতো চিকিৎসকদের হাসপাতালে উপস্থিত না হওয়া, রোগীদের ভোগান্তি, সরকারি ঔষুধের হিসাবের অনিয়ম, রোগীদের জন্য রান্না করা অস্বাস্থ্যকর খাবারসহ বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা পায়।
হাসপাতালের এক্সরে মেশিন, সিটিস্ক্যান মেশিন, এমআরআই দীর্ঘ দিন ধরে নষ্ট থাকলেও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে সুবিধা দিতে মেশিনগুলো ঠিক করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে হাসপাতাল থেকে রেজিস্ট্রার্ড খাতা ও কাগজপত্র জব্দ কর করা হয়। এ সময় চিকিৎসকদের সতর্ক করার পাশাপাশি হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও তদন্ত করার নির্দেশনা দেন দুদকের উপপরিচালক।
এ অভিযান চলাকালে সহকারী পরিচালক বিজন কুমার রায়, মো. সোহরাব হোসেন, উপসহকারী পরিচালক আফছার উদ্দিন মো. আল আমিন হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, হাসপাতালে রোগী দেখা ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যের একটি চক্র গড়ে ওঠেছে। ওই চক্রটি ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফারুক আহমেদসহ অন্যান্য ডাক্তারদের মাধ্যমে সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে থাকেন। সার্টিফিকেট দেওয়ার পর প্রাপ্ত টাকা থেকে বিভিন্ন হারে কমিশন পান তারা। এ ছাড়া হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বলেন। তা ছাড়া পছন্দের বিভিন্ন ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করাতে বলেন। সেখান থেকেও বিভিন্ন হারে কমিশন নেন তারা।
ভূয়া সার্টিফেকেটর শিকার দিলারা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে মারধর করা হয়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু প্রতিপক্ষরা আমার ছেলে একটি প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণ করে বলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে টাকা দিয়ে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে এমন সার্টিফিটেক নেয়। মার খেয়ে আমরা ছেলে তখন গুরুতর অসুস্থ। তা হলে সে কীভাবে ধর্ষণ করে? টাকার বিনিময়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এ সার্টিফেকেট দেয়। এতে আমরা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হই।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বৃদ্ধ সাহিদ শেখ (৬৫) বলেন, আমি সকাল ৯টায় ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে আসি। এসে দেখি রুমে ডাক্তার নেই। প্রায় ২ ঘন্টা অপেক্ষার পর ডাক্তার দেখাই। শুধু আমি না, এ হাসপাতালে যারাই ডাক্তার দেখাতে আসে তারাই চরম ভোগান্তিতে পড়ে।
মোল্লাহাট উপজেলার আব্দুল আজিজ বলেন, ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। প্রায় ২ ঘন্টা অপেক্ষার পর ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। হাসপাতালে এসে দেখি ডাক্তার নেই। এ হাসপাতালে বিছানা, বাথরুম অপরিচ্ছন্ন।
অভিযুক্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফারুক আহমেদের কাছে এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাওয়া হলে, তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
দুদক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাই। এ সময় টিকিটে বেশি টাকা নেওয়া, সার্টিফিকেটের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন, সময়মতো চিকিৎসকদের হাসপাতালে উপস্থিত না হওয়া, সরকারি ঔষধের হিসাবের অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা পাই।
তিনি আরও বলেন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফারুক আহমেদ ও ওয়ার্ড বয় মো. সোহেল শেখের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
গোপালগঞ্জ ২৫০-শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেস বিশ্বাস বলেন, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ওঠেছে তা তদন্ত করে প্রমাণ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পত্র পাঠানো হবে।
বাদল সাহা/মাহফুজ/এমএ/