১১ ডিসেম্বর ভোর রাত চারটা। দিনাজপুর থেকে গরু কিনে একটি মিনি পিকআপে করে গোপালগঞ্জে যাচ্ছিলেন নাজমুল ইসলাম। কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক সড়কের ফুলতলা হ্যাচারি এলাকায় পৌঁছালে ছয় থেকে সাতজনের একটি ডাকাতদল পিকআপের গ্লাসে ইট ছোড়ে।
এ সময় চালক পিকআপ থামালে ডাকাতদল এসে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে দুজনকে জখম করে। চালক এবং গরুর মালিককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাতটি গরু এবং নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। পরে কুমারখালী থানা পুলিশ এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এই ঘটনায় নাজমুল ইসলাম কুমারখালী থানায় একটি মামলা করেন। এর আগে ৪ ডিসেম্বর একই সড়কের বালুরমাঠ এলাকায় একটি মিনিট্রাক থামিয়ে রিপন আলী নামের এক ব্যবসায়ীর পাঁচটি গরু ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি জয়পুরহাট থেকে গরু কিনে ফরিদপুর যাচ্ছিলেন।
শুধু মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা নয়, কুষ্টিয়ায় চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ মাসে জেলায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২০০-এর বেশি। এসব ঘটনায় স্থানীয়রা থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইমেজ সংকটের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তারা কাজ করে যাচ্ছে।
১১ ডিসেম্বরের ডাকাতির ঘটনায় ভুক্তভোগী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকাতদল প্রথমে আমাদের দুজনকে কুপিয়ে জখম করে। আমার গরু নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না।’ অন্যদিকে ৪ ডিসেম্বর ডাকাতির কবলে পরা রিপন আলী বলেন, ‘ওই সড়কে (কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী) রাতে আর চলার উপায় নেই। আমার পাঁচটি গরু লুট করা হয়েছে। মামলা করেছি। কিন্তু পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমার ঘটনার পরও ওই রোডে আবারও ডাকাতি হয়েছে বলে শুনেছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে কুষ্টিয়া বাইপাস এলাকার একটি মার্কেটের ৯টি দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। নভেম্বরের শেষের দিকে একটি বহুতল ভবন থেকে চুরি করা হয় দুইটি মোটরসাইকেল। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গত ২ নভেম্বর। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় জেলার দৌলতপুরের ফিড ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন। এ সময় অস্ত্রধারী তিন দুর্বৃত্ত তার বাসার মধ্যে ঢুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ পাঁচ লাখ টাকা, স্বর্ণের চেইনসহ কিছু মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তার চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা বেরিয়ে এলে তাদেরকে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর থেকে ওই পরিবারটি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন জায়গায় এমন ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীসহ জনসাধারণের দাবি, পুলিশের তৎপরতার অভাবে এমন ঘটনা ঘটছে। ঘটনার পর পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো সুরাহা মিলছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাসেল আহাম্মেদ নামে কুষ্টিয়া শহরের এন এস রোডের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমি মনে করি পুলিশের কর্মকাণ্ড বেগবান হলে চুরি-ছিনতাই কমে যাবে। আগে অনেক জায়গায় সিসি ক্যামেরা ছিল। ৫ আগস্টের পর সেগুলো নেই। ফলে অপরাধ বাড়ছে। আমরা যারা ব্যবসায়ী আছি তাদের উদ্বেগও বেড়ে গেছে। দোকানে লাখ টাকার মালামাল রেখে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।’
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ মন্তব্য করে কুষ্টিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি মিজানুর রহমান লাকি বলেন, ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। আবার আমরা দেখছি পুলিশ তাদের কাজের ক্ষেত্রেও গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের জন্য আরও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে।’
এসব বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ কথা বলতে রাজি না হলেও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘এরই মধ্যে আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছি। উনাদের সঙ্গে সব বিষয়ে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রম কী হবে সে বিষয়ে পরিকল্পনা করেছি।’
তিনি বলেছেন, আমি যোগদানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে। এই ইস্যুতে আমরা আরও তৎপর থাকব।’