বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত আর বিস্তৃত পাহাড়ের হাতছানি থাকা কক্সবাজার শহরকে বলা হয় দেশের শীর্ষ পর্যটন নগরী। তবে নয়নাভিরাম এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হোটেল-রিসোর্টের চাকচিক্যের আড়ালে-লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। নানা বয়সী পর্যটকের ঘুরে বেড়ানো কিংবা নবদম্পতিদের মধুচন্দ্রিমার জন্য সবচেয়ে পছন্দের এই সমুদ্রসৈকতের শহর এখন ‘অপরাধের নগরীতে’ পরিণত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণের জেলা কক্সবাজার ইয়াবা পাচারকারী চক্রগুলোর ‘নিরাপদ স্বর্গ’ হয়ে উঠেছে। অপরাধের তালিকা থেকে বাদ যায়নি মানব পাচারের মতো ঘটনা। এমন অনেক ঘটনায় ২০২৪ সালজুড়ে আলোচনায় ছিল কক্সবাজার। গেল চারমাসে জেলায় ৫৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ডাকাত দলের হাতে সেনা কর্মকর্তা খুন আর মাকে হত্যার পর থানায় ছেলে হাজির হওয়ার মতো ঘটনা।
এই চারমাস কক্সবাজার ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। এসব হত্যাকাণ্ড ছাড়াও জেলায় অপহরণ বাণিজ্য, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ বেড়েছে কয়েকগুণ। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশেষ জেলা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও বেশি তৎপরতা বাড়ানো দরকার। প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করাও জরুরি। পুলিশ জানিয়েছে, নানামুখী তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে জেলায় ১৭৯ জন হত্যার শিকার হন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭৬টি। শেষ চারমাসেই খুন হয়েছেন ৫৫ জন। পুরো বছরে সবচেয়ে বেশি ২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জুন মাসে। আরেক প্রতিবেদনে পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে অপহরণের মামলা হয়েছে ৪০টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৯২ জন।
তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে কক্সবাজার শহরের বাসটার্মিনাল এলাকায় ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর ২৩ নভেম্বর রাত আড়াইটার দিকে কক্সবাজার শহরে মাদক সেবনের টাকা চেয়ে না পাওয়ায় মাকে কুপিয়ে হত্যার পর থানায় হাজির হয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেয় এক যুবক। কক্সবাজার পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিলংজা পশ্চিম বড়ুয়া পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। সদর থানার ওসি ইলিয়াস খান তখন সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন। নিহত আনোয়ারা বেগম (৫৫) একই এলাকার নিয়াজ আহমেদের স্ত্রী। গ্রেপ্তার হোসাইন মোহাম্মদ আবিদ (২৮) নিহতের ছেলে।
২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে চকরিয়ায় পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় ডাকাতির খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩)। এরপর তিনি অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তদের তাড়া করতে থাকেন। একপর্যায়ে ডাকাত দলের সদস্যদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন মেধাবী এই তরুণ সেনা কর্মকর্তা। যা দেশজুড়ে আলোচিত হয়।
এক ডিসেম্বর রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের বালুবাসা গ্রামে সাহাব উদ্দিন (২৩) নামের এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি একই ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া তিতারপাড়া গ্রামের এমদাদ মিয়ার ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন সাহাব উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের দাবি, স্থানীয় তিন ব্যক্তিকে জিম্মি করে তাদের কাছে থাকা নগদ টাকা লুটের সময় গণপিটুনিতে সাহাব উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে।
২৬ আগস্ট রাত ১০টায় পেকুয়া বাজারের পশ্চিমে ওয়াপদা অফিসের সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে শ্রমিক দল নেতা শহিদুল ইসলাম শওকতকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার দুই ভাই গুরুতর আহত হন। ২১ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের উখিয়ার ময়নারঘোনা আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-১৭) রোহিঙ্গা পরিবারের ঘরে ঢুকে গুলি করে বাবা-ছেলে-মেয়েসহ তিনজনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিহতরা হলেন- আহমেদ হোসেন (৬০), তার ছেলে সৈয়দুল আমিন (২৮) ও মেয়ে আসমা বেগম (১৩)।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, কক্সবাজারে সাধারণত মাদক কারবারকে কেন্দ্র করেই বেশির ভাগ অপরাধ সংঘটিত হয়। নির্দিষ্ট এলাকায় যারা আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন, তারাই মাদক কারবারে সুবিধা নেন। এতে, মাদক কারবারিদের সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত কোন্দল চলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যা আজন্ম শত্রুতায় রূপ নেয়। ফলে তাদের মধ্যে হত্যা, পাল্টা হত্যার ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে।
কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী আবু তাহের চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। এ জেলার সবচেয়ে গুরুতর সংকট ইয়াবা পাচার এবং রোহিঙ্গাদের ঢল। কক্সবাজারের সঙ্গেই মিয়ানমার সীমান্ত। গভীর বন ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বেষ্টিত এই সীমান্তে নজরদারি জোরালো না হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ থেকে অবাধে মাদক আসছে। এতে হত্যা ও অপহরণের ঘটনা আরও বেড়েছে।’
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের আর দশটি জেলার ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক পার্থক্য আছে। দ্রুত বিচার শেষ করতে বিশেষ আদালত করা না হলে এই সমস্যার আশু সমাধান নেই। একই সঙ্গে বিশেষ জেলা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও বেশি তৎপরতা বাড়ানো দরকার। প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করাও জরুরি।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অপরাধ কমাতে পুলিশ নানামুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।’