হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় কর্ণফুলী নদীর ১৯টি ঘাট ইজারা দিতে পারছে না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। তাই খাস কালেকশনের নামে এতদিন পুরোনো ইজারাদাররা টোল আদায় করতেন। সরকার পরিবর্তনের পর এখন অন্য একটি পক্ষ টাকা তুলছে। ঘাট থেকে টোল তোলা অব্যাহত থাকলেও কর্তৃপক্ষকে নামমাত্র রাজস্ব দিচ্ছেন ‘খাস কালেকশন’ আদায়কারীরা। এতে বছর শেষে চসিক কর্তৃপক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে।
চসিকের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঘাটগুলো বাংলা সনের শুরুতে নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে। তবে হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশনের কারণে বাংলা ১৪৩১ সনের ঘাটগুলোর ইজারা স্থগিত রয়েছে। ফলে পুরোনো ইাজারাদাররা ঘাটগুলো থেকে টোল আদায় করতেন। তারা এর নাম দিয়েছিলেন খাস কালেকশন, যা এখনো চলমান রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আগের মেয়রের নামও ভাঙিয়ে খাস কালেকশনে নিয়োজিত ছিলেন।
চসিক ১৪৩০ বাংলা সনে ১৯টি ঘাট থেকে মোট ৫ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করেছিল। এর আগের বছর হয়েছিল ৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
চসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন ঘাটগুলো হলো পতেঙ্গা ১৫ নম্বর ঘাট, সল্টগোলা ঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, নয়ারাস্তা পাকা পুলঘাট, সদরঘাট, ফিশারিঘাট, নতুনঘাট, এয়াকুবনগর লইট্যা ঘাট, পতেঙ্গা ১৪ নম্বর ঘাট, গুচ্ছগ্রাম ঘাট, ১১ নম্বর মাতব্বর ঘাট, ১২ নম্বর তিনটিংগা ঘাট, ৭ নম্বর রুবি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসংলগ্ন ঘাট, ৯ নম্বর বিওসি ঘাট, অভয় মিত্র ঘাট, চাক্তাই খালের পাশে পানঘাট থেকে গাইজ্জের ঘাট, পতেঙ্গা চাইনিজ ঘাট, বাকলিয়া ক্ষেতচর ঘাট, চাক্তাই ঘাট ও চাক্তাই লবণ ঘাট।
চসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা সাব্বির রাহমান সানি বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি পক্ষ ঘাটগুলো দখলে নিয়েছে। আগে যারা ইজারাদার ছিলেন তাদের মাধ্যমে খাস কালেকশন আদায় হতো। যদিও আমাদের রাজস্ব আদায় চলমান রয়েছে। এখানে আমাদের চসিক কর্মীদের মাধ্যমেও টোল আদায় করা হয়।’
চসিকের প্রধান নির্বাহী শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, ‘হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তাই ইজারা দেওয়া হয়নি। আমরা হাইকোটের সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু দেশের চলমান পরিস্থিতির কারণে তা পিছিয়ে গেছে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’
অভয় মিত্র ঘাটের খাস কালেকশনকারী আবুল হোসেন জানান, আগে যারা টোল তুলতেন তারা এখন নেই। তিনি দৈনিক ২ হাজার টাকা রাজস্ব দিচ্ছেন। বাংলাবাজার ঘাটের লোকমান দয়াল জানান, দৈনিক সাড়ে ৫ হাজার টাকা রাজস্ব দেওয়ার মাধ্যমে তিনি এই ঘাট দেখাশোনা করছেন।
সরেজমিনে সদরঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সদরঘাটের এক পাশে লাইটার জাহাজ থেকে পাথর নামানো হচ্ছে, অন্য পাশে কয়লা নামানো হচ্ছে। ঘাটের রাস্তা দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার সময় টোল দিতে হচ্ছে।
এভাবেই কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশন তিনটি ঘাট দখলে রেখেছে। চসিক কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি ঘাটবাবদ দৈনিক ৩ হাজার টাকা খাস কালেকশন দেওয়া হয়। অথচ একেকটি ঘাট থেকে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা টোল আদায় হয়। নামেমাত্র রাজস্ব দিয়ে দৈনিক বাকি টাকা পকেটে নেয় সংগঠনটি।
কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি এম এম পেয়ার আলী বলেন, ‘খাস কালেকশন দেওয়ার শর্তে ইজারা নিয়েছি। প্রতিদিন রাজস্ব দিই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুরোনো ইজারাদার বলেন, ‘খাস কালেকশনে টোল আদায় কম দেখানো গেলে পরবর্তী বছর কম টাকায় ইজারা নেওয়া যায়। এ ছাড়া খাস কালেকশনে পরের বছর আইনি ঝামেলা এড়িয়ে ব্যবসায়ীরা কম টাকায় ইজারা নিতে পারেন। এভাবেই কিছু অসৎ কর্মকর্তার কারসাজিতে কয়েক বছর পরপর গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোর ইজারামূল্য কমে যায় এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’
সল্টগোলা ডাঙ্গারচর পাটনিজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বউ-বাচ্চা নিয়ে দুমুঠো ডাল-ভাত খাওয়ার জন্য সাম্পান চালাই। সরকার যেভাবেই রাজস্ব আদায় করে করুক, আমরা যাত্রী পারাপার করতে চাই। কারণ কর্ণফুলীই আমাদের জীবন-মরণ। আমরা এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে পারব না।’