একটি সেতুর অপেক্ষায় পার হলো ৫৪ বছর। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার বলেছেন, ‘সেতু হবে, হচ্ছে, হয়ে যাবে।’ এমন আশ্বাস পেতে পেতেই পার হয়ে গেল এতটি বছর। স্থানীয়রা আর আশ্বাসের বাণী শুনতে চান না। সেতুর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শিশু থেকে অনেকেই এখন বৃদ্ধের পথে। কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলছেন, ‘মৃত্যুর আগে এই সেতু হয়তো আর দেখে যেতে পারব না।’
দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার সাতনালা ইউনিয়নের সাতনালা গ্রামের তারকশাহার হাট এলাকা। সেখানকার ইছামতী নদীর ওপরে স্থানীয়দের নিজ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ২৫০ ফুট বাঁশের সাঁকো। বাইসাইকেল নিয়ে সাঁকো পার হওয়ার সময় স্থানীয় মো. আজিমুদ্দিনের (৯০) সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা প্রসঙ্গে তিনি এসব বলেন।
চিরিরবন্দর উপজেলার দুই ইউনিয়ন পরিষদ। পূর্ব পাশে আলোকডিহি, পশ্চিমে সাতনালা। এই দুই ইউনিয়নের মধ্য দিয় প্রবাহিত হচ্ছে ইছামতী নদী। দুই ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের পথ এই নদী। এই পথ পারি দিতে গ্রামবাসী নিজেরাই টাকা তুলে স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি করেন বাঁশের সাঁকো। এর ফলে দুই ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এই সাঁকোর ওপর দিয়ে চলাচল করছে।
প্রতিবছর সাঁকোটি রোদ, বর্ষা, শীত ও হালকা যানবহন চলাচলের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। নিজেদের প্রয়োজনে আবার টাকা-পয়সা ও স্বেচ্ছাশ্রমে এই বাঁশের সেতু তৈরি করে থাকেন। এভাবেই চলছে।
এদিকে সেতুর অভাবে পাঁচ গ্রামের মানুষকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ঘুরে ঘাটের পাড় কলেজ মোড় সেতু দিয়ে চলাচল করতে হয়। অথচ এই দুই ইউনিয়নের সংযোগস্থল পাঁচ মিনিটের পথ বাঁশের সাঁকো পার হলেই তারকশাহার হাটসহ আলোকদীঘি ইউনিয়ন থেকে সাতনালা ইউনিয়ন পরিষদে সহজেই যাতায়াত করা যায়।
সাতনালা ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এ সাঁকো দিয়ে এলাকার বেকিপুল বাজার, কিষ্টহরি বাজার, চম্পাতলী বাজার, বিন্নাকুড়ির হাট, তারকশাহা মডেল স্কুল, ইছামতী ডিগ্রি কলেজ, ইছামতী ফাজিল মাদ্রাসা, রানীরবন্দর, সুইহারি বাজারসহ পাঁচ গ্রামের প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ১৫ হাজার মানুষকে প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াত, কৃষিজমিতে চাষাবাদ, ব্যাংকের লেনদেন, বাজারঘাটসহ বিভিন্ন কাজের জন্য চলাচল করতে হয়।
বাঁশের সাঁকোর পশ্চিম দিকেই তারকশাহার হাট। অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমে এই সাঁকো তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত থাকা আমিনুল ইসলাম (৫৫), দেলোয়ার হোসেন (৪৮), জিয়াউর রহমান (৪৯) বলেন, ‘নিজেদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ও আর্থিক সহযোগিতায় আমরা দুই ইউনিয়নের শতাধিক মানুষ এই সাঁকোটি করেছি। আমাদের প্রতিবছর আবার সংস্কার করতে হয়। তাই এটি আমাদের প্রতিবছরই নির্মাণ করতে হয়। নিজেদের কিছুটা দুর্ভোগ লাঘবের জন্য।’
স্কুলছাত্র রাকিবুল ইসলাম বলে, ‘আমাদের বাড়ি সাতনালা ইউনিয়নের তারকশাহার গ্রামে। প্রতিদিন আমাকে আলোকডিহি ইউনিয়নের কৃষ্ণহরি স্কুলে যেতে হয়। নদীর ওপারেই আমাদের স্কুল। সাঁকোটি না থাকলে তিন কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো।’
পথচারী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার বাড়ি আলোকডিহি ইউনিয়নের মুন্সীপাড়া গ্রামে। আমি একটি স্কুলে চাকরি করি। যেতে হয় রানীরবন্দরে। এই সাঁকো না হলে আমাকে অনেক কষ্ট করে যেতে হতো। তারপর সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল পার হতে হয়।’
স্থানীয় নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, ‘ওই পারে আমাদের জায়গাজমি রয়েছে। জমি চাষাবাদ করতে বা সেখান থেকে ফসল কেটে বাড়িতে নিয়ে আসতে গেলেও আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। একাধিকবার জনপ্রতিনিধিরা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ করেনি।’
স্থানীয় জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং দিনাজপুর-৪ আসন চিরিরবন্দর ও খানসামা আসনের চারবারের সংসদ সদস্য ও দুবারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন এ এইচ এম মাহমুদ আলী। তিনি একাধিকবার জনসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ভোট নেওয়ার সময়ও তিনি একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এখানে একটি সেতু তৈরি করে দেবেন। কিন্তু তিনি তার কথা রাখতে পারেননি বা এখন পর্যন্ত ব্রিজের কোনো নমুনাও আমরা দেখতে পাইনি।’
স্থানীয় কাজীমুদ্দিন বলেন, ‘এর আগে কয়েকবার উপজেলা ও দিনাজপুর জেলা প্রকৌশলীরা এখানে এসে মাটি পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের এখানে আসেন, কিছু ছবি তোলেন, দু-একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিভিন্ন ফিতা দিয়ে মাপজোখ করে চলে যান। এভাবেই চলে গেল ৫৪ বছর। এখন আসার বাণী ছাড়া আর কিছুই নেই, বাস্তবায়ন হয় না।’
সাতনালা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য আইজার রহমান বলেন, ‘বাঁশের সাঁকো ভেঙে যাওয়ার দীর্ঘ ২০ বছর পর জনদুর্ভোগ লাঘবে আবার স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। এই জায়গায় সেতু করার বিষয়ে অনেক দূর পর্যন্ত আলোচনা করা হলেও রাজনৈতিক নেতারা কেন জানি এখানে অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। তাই এখানে সেতু হয়নি।’
জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দিনাজপুর জেলা অনেক বড় একটি জেলা। বেশ কিছু জায়গায় সেতুর প্রয়োজন রয়েছে। আমরা সেতু করার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। দিকনির্দেশনা এলেই বাস্তবায়ন হবে।’