চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ ১৮ মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছরে তা কেবল পাইলিংয়েই আটকে রয়েছে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে উপজেলার লাখো মানুষ, হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চরম বিদ্যুৎসংকটে ভুগছে।
বর্তমানে ফটিকছড়িতে বিদ্যুতের একমাত্র উৎস হাটহাজারী গ্রিড থেকে আসা ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ৩৩ কেভি লাইন। এই লাইনের কোনো বিকল্প সংযোগ না থাকায় সামান্য ত্রুটিতেই পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় বড়ুয়া খবরের কাগজকে বলেন, ৩৩ কেভি লাইনের জন্য ৩৮ কিলোমিটার অনেক বেশি দূরত্ব। এতে শেষ প্রান্তে ভোল্টেজ এতটাই কমে যায় যে কারখানার ভারী যন্ত্র চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবন ও স্বাস্থ্যসেবায়।
ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কামরুল হাসান খবরের কাগজকে জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভর্তি রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যহত হচ্ছে।
বিবিরহাট বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সাইয়েদ মো. ইলিয়াছ খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ গেলে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়, ব্যাংক লেনদেন থেকে পণ্যের অর্ডারসহ সব কাজ থমকে যায়। একদিনের বিদ্যুৎহীনতায় ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ বিশাল।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, সংকট নিরসনে ২০২১ সালের ৪ আগস্ট পিজিসিবি এবং হিয়োসাং এনার্জিপ্যাক কনসোর্টিয়ামের মধ্যে নারায়ণহাটে সাবস্টেশন নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শর্ত ছিল ১৮ মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। তবে ২০২০ সালে এই প্রকল্পের শুরুতেই দরপত্র জমার সময়সীমা অন্তত পাঁচ বার বাড়ানো হয়েছে। পরে ডলারসংকট ও কোভিডের অজুহাতে মেয়াদ বাড়তে থাকে, কিন্তু কাজ এগোয়নি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর ফটিকছড়ি জোনাল অফিসের এজিএম আশিক মাহমুদ সুমন খবরের কাগজকে বলেন, পিডিবি থেকে হস্তান্তরিত পুরনো এই লাইন দিয়ে উপজেলার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, 'এই গ্রিড না হওয়া পর্যন্ত আপনারা ভালো বিদ্যুৎ পাবেন না। এটা হলে আশা করি ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হবে। বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করে দেখেন যেনো নারায়ণহাটের নতুন গ্রিডটা যেন দ্রুত চালু হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পিডিবি থেকে হ্যান্ডওভার হওয়া এই পুরনো জরাজীর্ণ লাইনটাই ফটিকছড়ির মূল সমস্যা।'
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পিজিসিবির উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহিদ হাসান খান জানান, ডলারের দাম ৮০ থেকে ১২২ টাকায় বাড়ায় ঠিকাদার কাজে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। চুক্তি বাতিলের চেষ্টা হলেও নতুন টেন্ডারের জটিলতায় এখন একই ঠিকাদার দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ শেষ করার পথ খোঁজা হচ্ছে।
কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে এনার্জিপ্যাকের কর্মকর্তা আমিনুর রহমানসহ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি। সাইট ইঞ্জিনিয়ার সালমানকে সরেজমিনে গিয়েও পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি আর ফোন ধরেননি।
নাজমুল আলম/থিওটোনিয়াস