রাজশাহীর পদ্মাতীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাসী হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) দরগাহ শরিফে রমজানের প্রথম দিন থেকে মাসব্যাপী গণইফতার চলছে। এখানে প্রতিদিন একসঙ্গে ইফতার করেন সহস্রাধিক মানুষ। এখানে ধনী-গরিবের একসঙ্গে ইফতার করার মধ্যে কোনো বৈষম্য দেখা যায় না।
শুক্রবার (৭ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, দরগাহ শরিফকে দৃষ্টিনন্দন করতে ২৪ কোটি ৮৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ চলছে। ফলে ধ্বংস্তূপের মতো ভাঙা ভবনের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে বসে ইফতার করছেন সবাই। ইফতারের পদ হিসেবে আছে মুড়ি, ছোলা, খেজুর, কলা, জিলাপি, বেগুনি ও পেঁয়াজু।
জানা গেছে, বিশেষ দিনে খিচুড়ি, বিরিয়ানি থেকে শুরু করে গরুর কিংবা মুরগির মাংস, ছোলা, পেঁয়াজু, জিলাপি, খেজুরে আপ্যায়িত করা হয়। পেট ভরে ইফতার করতে পেরে রোজাদাররাও তৃপ্তি প্রকাশ করেন। এই ইফতার বিতরণ করেন মাজারের ভক্তরা।
দরগাহর ভক্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) দরগাহ শরিফে বিনামূল্যে ইফতার বিতরণের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। রমজানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ইফতার বিতরণ করা হয়। এখানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ ইফতার করেন। তাদের মধ্যে স্থানীয় গরিব, অসহায় মানুষের পাশাপাশি ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থী, পথচারী, বিভিন্ন গাড়ির চালক, ফকিরসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। তবে প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ ইফতারিতে অংশ নেন।
জানা যায়, বহু পীর-সাধকের পুণ্যভূমি রাজশাহী শহর। একসময় উত্তরের এই জনপদের মানুষ কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি ও কুপ্রথার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। পরে পীর-সাধকদের আগমন ঘটতে থাকে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ছড়িয়েছিলেন ইসলামের আলো। এদেরই একজন জ্ঞানতাপস হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)। সুদূর বাগদাদ থেকে এসেছিলেন তিনি। রাজশাহী নগরের পদ্মার তীর ঘেঁষে তার মাজার। মাজারকে ঘিরে ওই এলাকার নাম এখন দরগাহপাড়া। প্রতিবছরের মতো এবারও এই দরগাহে প্রতিদিন সহস্রাধিক রোজাদারকে ইফতার করানো হচ্ছে। ভক্ত-আশেকানদের দান আর মাজার কর্তৃপক্ষের টাকায় চলে রাজশাহীর সর্ববৃহৎ এই গণইফতার। ভক্তরা রমজানের প্রতিটি দিন রোজা, নামাজ ও মাজার জিয়ারতের পর যোগ দেন গণইফতারে। এই গণইফতারে অংশ নিয়ে খুশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত-আশেকানরাও। তাদের মতে, হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) দরগাহ শরিফে ইফতার করা শুধু পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, আত্মিক প্রশান্তির উৎস। অনেকেই মনে করেন, এই পবিত্র স্থানে ইফতার করার মাধ্যমে তারা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে এখানে চলে আসছে গণইফতারের ঐতিহ্য।
নগরীর মোল্লা ছাত্রাবাসের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পবিত্র মাহে রমজানে সারা দিন রোজা রেখে মেসে সবাই মিলে ইফতার করতাম। কিন্তু যখন জানতে পারলাম এখানে একসঙ্গে বহু মানুষ ইফতার করেন, তখন এখানে এসে সবার সঙ্গে ইফতার করতে বসে গেছি। জীবনে এই প্রথম এত মানুষের সঙ্গে ইফতার করলাম।’
আজমল হোসেন বাবু নামে দরগাহর এক ভক্ত বলেন, ‘দরগাহে মানত নিয়ে আসা ভক্তদের সুবিধার জন্যই গণইফতারের আয়োজন করা হয়। তাদের দান আর মাজার কর্তৃপক্ষের টাকায় চলে এই আয়োজন। প্রতিদিন এখানে সহস্রাধিক ধনী-দরিদ্র একসঙ্গে বসে ইফতার করেন।’