দেয়াল ও ছাদের কার্নিশে ঝুলে আছে সারি সারি মৌচাক। মৌমাছির গুনগুন গানে মুখরিত চারদিক। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন মুসল্লিরা। পাশাপাশি পবিত্র কোরআন শেখার জন্য প্রতিদিন চলাচল করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু অবাক করার বিষয়, বছরের পর বছর মুসল্লি আর শিক্ষার্থীদের, এমনকি পথচারীদের সঙ্গে মৌমাছির কোনো বৈরী সম্পর্ক হয়নি। একে অন্যকে কেউ কোনো ক্ষতি করছে না। এ যেন মৌমাছির সঙ্গে মুসল্লি-শিক্ষার্থীদের এক মধুর বন্ধুত্ব।
বলছিলাম, যশোরের অভয়নগর উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের মথুরাপুর পুড়াখালী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মৌমাছির অভয়ারণ্যের কথা। প্রায় ১০ বছর ধরে এ অবস্থা বিরাজ করছে। মৌমাছির দলগুলো সরিষা ফুলের সময় আসে। আবার তারা গন্তব্যে ফিরে যায়।
একদিকে মসজিদের মিনারে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে বাইরে মৌমাছির গুনগুন শব্দ। মনে হয় মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি এবং সকালে কোরআন পড়তে আসে মক্তবের শিক্ষার্থীদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে মৌমাছির দল। প্রকৃতি আর মানুষের সেতুবন্ধনের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য অনেকেই দেখতে আসেন মথুরাপুর পুড়াখালী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। স্থানীয় লোকজন এটিকে মৌমাছির মসজিদ বলেই চেনেন। দিন দিন এ নামেই এলাকায় পরিচিতি বাড়ছে। মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
মথুরাপুর পুড়াখালী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সম্মুখভাগের দেয়াল ও ছাদের কার্নিশে অসংখ্য মৌচাক রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর সরিষার মৌসুমে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি এসে এই মসজিদে আশ্রয় নেয়। বছর শেষে তারা আবার চলে যায় আপন গন্তব্যে। তবে এসব মৌচাক থেকে সংগৃহীত মধু বিক্রি করে মসজিদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।
মথুরাপুর গ্রামের মুসল্লি রবিউল গাজী বলেন, ‘মসজিদে এমন মৌচাক দেখে খুবই ভালো লাগে। অন্য কোথাও এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। মৌমাছি কারও কোনো ক্ষতি করে না, এটাই বড় কথা।’ আরেক মুসল্লি আব্দুস ছাত্তার মোল্লা বলেন, ‘মৌমাছিগুলো খুব শান্তভাবে থাকে। মাঝে মধ্যে আমাদের মনেই হয় না, মসজিদে এতগুলো মৌচাক রয়েছে।’
মসজিদের মুসল্লি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যাই মৌমাছি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করে না, আমরা একে অন্যের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করি। আমাদের কোমলমতি শিশুরা এখানে কোরআন শিখতে আসে। কিন্তু মৌমাছি নিয়ে আমাদের কোনো ভয় নেই।’
মথুরাপুর পুড়াখালী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ বেলাল হোসেন বলেন, ‘১০ বছর ধরে মৌমাছি মসজিদের চারপাশে বাসা বেঁধে বসবাস করছে। তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করে না, আমরাও তাদের কোনো ক্ষতি করি না। মৌমাছিগুলো সরিষা ফুলের সময় আসে। মাঠ থেকে সরিষা উঠে গেলে আবার মৌমাছিগুলো গন্তব্যে চলে যায়। এসব মৌচাক থেকে সংগৃহীত মধু বিক্রি করে মসজিদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। এই মধু কেনার জন্য ক্রেতারা খুবই আগ্রহী।’
মসজিদের সভাপতি শাহজাহান মোড়ল বলেন, ‘বছরের পর বছর সরিষা মৌসুমে মসজিদের দেওয়ালে ও কার্নিশে মৌমাছি বাসা বাঁধে। আবার চলে যায়। আল্লাহর রহমতে তারা কেনো ক্ষতি করে না। এলাকার মানুষও মৌমাছির চাকে বিরক্ত করে না। এগুলো অনেকে দেখতে আসেন। বিশেষ করে এক সঙ্গে অনেকগুলো মৌচাক দেখে অনেকে অবাক হন।’