বরিশাল নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির অন্তত অর্ধডজন নেতা এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান পদধারী কয়েকজন নেতা রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে বিভিন্ন সময় বিতর্ক ও অভিযোগের মুখে পড়েছিলেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘পরিচ্ছন্নতা’ নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।
চেয়ারম্যান পদের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয়, বরিশাল জেলা ও মহানগর কমিটির যেসব নেতাদের নাম আলোচনায় আছে, তারা হলেন- বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়েদুল হক চাঁন, বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহীন, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল ইসলাম, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ এবং জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নুরুল আলম ফরিদ।
দলীয় সূত্র জানায়, এই নেতাদের নাম সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। পদটি পেতে অনেকেই প্রভাবশালী নেতাদের কাছে লবিং ও তদবির চালাচ্ছেন। আরও কয়েকজন নেতা নীরবে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরে এসব নেতার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কারও বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্য, কারও বিরুদ্ধে বাসস্ট্যান্ড দখল, কারও বিরুদ্ধে কাজীদের সমিতি দখল, আবার কারও বিরুদ্ধে বিএনপির উপজেলা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সময় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কারও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শারীরিক ফিটনেস নিয়েও প্রশ্ন আছে।
তার মতে, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক পদ। এখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাই প্রধান হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তিগত লবিং-তদবির কাজ করছে।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘যিনি নগরকে জানেন, মানুষের প্রয়োজন বোঝেন- এমন স্থানীয় ব্যক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়া উচিত।’
অন্যদিকে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন, ‘আমার কোনো পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা নেই। তবে দায়িত্ব পেলে তা যথাযথভাবে পালনে সচেষ্ট থাকব।’
সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি টুলু রানী কর্মকার বলেন, ‘গত প্রায় ৩ দশকে বরিশাল নগরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে সত্য, কিন্তু তা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির ওপর থাকবে। তারা নগর উন্নয়নের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে পারবে, যার ভিত্তি করে শহরের উন্নয়ন হবে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রমে জনআস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। নতুন এই সংস্থার নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কতটা যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ঠিক হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৩ বছর আমরা বিভাগীয় সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত। এটা চরম বৈষম্য। আমাদের প্রথম দাবি হচ্ছে- সব বিভাগীয় শহর যেসব সুবিধা পাচ্ছে আমরাও যেন তা পাই। আর এর সঙ্গে যদি বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা জড়িত থাকে, তাহলে কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। সরকারিভাবে এর গঠন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে। তখন নগরের পরিকল্পিত উন্নয়ন, বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।’