গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দিতে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২১৪তম জন্মতিথি উপলক্ষে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মতুয়া সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ মহা বারুণীর স্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পুণ্যের আশায় দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মতুয়া ভক্তরা এ স্নানে অংশ নিচ্ছেন। এই উৎসব উপলক্ষে ঠাকুরবাড়িতে বসেছে তিন দিনব্যাপী গ্রামীণ মেলা। এ ছাড়া ঠাকুরবাড়িসহ আশপাশ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জারি করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ সালের ১১ মার্চ কাশিয়ানী উপজেলার সাফলীডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লীলা করেন পার্শ্ববর্তী ওড়াকান্দি গ্রামে। তার জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে প্রতিবছর ওড়াকান্দিতে এ স্নানোৎসব ও বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার (২৬ মার্চ) রাত ১১টা থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে বারুণী স্নান উৎসব। পাপমুক্তি ও পুণ্যের আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অন্তত ১০ লাখের বেশি ভক্ত অংশ নিচ্ছেন এই উৎসবে। হরিজপ, ঢাকঢোল ও কাঁসর বাজিয়ে ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করছেন ভক্তরা। ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে ঠাকুরবাড়িসহ আশপাশের অন্তত পাঁচ কিলোমিটার এলাকা। ভক্তরা মন্দিরে পূজা-অর্চনা শেষে ঠাকুরবাড়িতে অবস্থিত কামনা সাগর ও বাসনা সাগরে (মূলত পুকুর) স্নান করে ঠাকুরের কাছে পাপমুক্তি, পুণ্য লাভ ও দেশবাসীর মঙ্গল প্রার্থনা করেন।
এই উৎসব ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে ঠাকুরবাড়ি এলাকায় উঁচু পর্যবেক্ষণ চৌকি ও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ ছাড়া মতুয়া সংঘের প্রায় ৭ শতাধিক স্বেচ্ছাসবক সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
স্নানোৎসবকে ঘিরে ঠাকুরবাড়ির পাশ ঘেঁষে ৬০ একর জায়গাজুড়ে বসেছে তিন দিনব্যাপী লোকজ মেলা। মেলায় কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটির তৈরি জিনিসপত্র ও খেলনাসামগ্রী, তালপাখা, চানাচুর, মিষ্টির দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁ বসেছে।
এই স্নানোৎসবে খুলনা থেকে আগত অশোক বিশ্বাস বলেন, ‘পুণ্যের আশায় আমি ঠাকুরবাড়িতে এসেছি। বিশ্বাস করি এখানে স্নান করে পুণ্য লাভ করেছি। সেই সঙ্গে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করেছি।’
মাদারীপুর থেকে আসা কলেজছাত্র পলাশ বিশ্বাস বলেন, ‘আমি এবারই প্রথম ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়িতে এসেছি বন্ধুদের সঙ্গে। স্নান করলাম। পরিবারের সবার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছি।’
যশোর থেকে আসা পুণ্যার্থী শিউলী বিশ্বাস বলেন, ‘গত পাঁচ বছর পরিবার নিয়ে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির বারুণী স্নানে অংশ নিতে আসি। এখানে স্নান করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়, সকল পাপ-কষ্ট দূর হয়।’
উৎসব প্রসঙ্গে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর পরিবারের সদস্য ও স্নানোৎসব কমিটির সভাপতি সুব্রত ঠাকুর বলেন, ‘এখানে পুণ্য লাভের আশায় সারা দেশ থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন, স্নান করেন। শুধু বাংলাদেশ নয়- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, চীন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মতুয়া ভক্তের আগমন ঘটে। ভক্তরা এখানে এসে স্নান করলে তাদের মনোবাসনা পূরণ হয়।
এ উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের থাকার জন্য আবাসন ও প্রসাদের ব্যবস্থার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও মতুয়া সংঘের ৭ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের তৎপরতায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
এ ছাড়া গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘এ স্নানোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ঠাকুরবাড়ি এলাকায় উঁচু পর্যবেক্ষণ চৌকি ও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।’
বাদল সাহা/নাইমুর/