বাংলা নববর্ষ মানেই উৎসব আর উৎসব মানেই মানুষে মানুষে মিলন। তবে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে নববর্ষ উদযাপনের রীতিতে আছে ব্যতিক্রমী সৌন্দর্য। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলা বছরের দ্বিতীয় দিন হলেও, পঞ্জিকা অনুসারে এখানেই উদযাপন হয় নববর্ষের মূল আয়োজন। এই উপলক্ষে বসে একদিনের বৈশাখী মেলা, যা টিকে আছে টানা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে। কথিত আছে, এই মেলার শুরু ব্রিটিশ আমল থেকেই।
চুনারুঘাট উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ঘিরেই বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। গ্রামীণ বাংলার নানা উপকরণ, কৃষিপণ্য ও দেশীয় খাবারের পসরা নিয়ে হাজির হন দোকানিরা। মেলার প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকে বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ।
ছবি: খবরের কাগজ
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও উপকরণের ভিড়-লাঙল, জোয়াল, মই, ঘাইল-ছিয়া, মাছ ধরার ঝাঁকি জাল, ভাঁড়, কলসি ইত্যাদি। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এ মেলাই তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় কৃষিপণ্য কেনাকাটার সুযোগ।
এই মেলায় আসেন অনেক প্রবীণ মানুষ, যারা ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে প্রথম এসেছিলেন। এখন একাই আসেন, কিন্তু চোখে-মুখে সেই পুরনো দিনের ঝলক।
ছবি: খবরের কাগজ
স্থানীয় আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এই মেলাটি ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ছোটবেলা বাবা-দাদার সঙ্গে মেলা ঘুরতে আসতাম। এখন, নিজের নাতি-নাতনীদের নিয়ে আসি।’
মমরাজ মিয়া বলেন, ‘বছরে কৃষিকাজে যত সরঞ্জাম দরকার, সবগুলো এই একদিনেই এখান থেকে কেনা হয়। এমন কোনো কৃষিপন্য নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না। এমনকি কোনো কোনো জিনিস এখন বিলুপ্ত, বাজারে পাওয়া যায় না, কিন্তু এখানে ঠিকই ওঠে।’
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে ছবিটা। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় আগের মতো কৃষি উপকরণের চাহিদা কমেছে। অনেক বিক্রেতাই জানান, তারা এবার আগের তুলনায় কম পণ্য এনেছেন।
বিক্রেতা ছাবু মিয়া বলেন, ‘আগের মেলা আর এখনের মেলার মধ্যে রাত-দিন তফাৎ। আগে মই, লাঙ্গল বিক্রি করে দম ফেলতে পারতাম না। এখন বেচাবিক্রি কমে গেছে।। মানুষ আধুনিক যন্ত্রে চাষ করে, এসব কিনে কী করবে? তবুও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমরা এসেছি। কমবেশি বেচাবিক্রি হচ্ছে।’
ছবি: খবরের কাগজ
তিনি বলেন, ‘ধান চাষে না লাগলেও, নানা সবজি চাষের জন্য লাঙ্গল লাগে। যে কারণে কম-বেশি বেচা-বিক্রি হয়।’
মেলায় বসেছে মুখরোচক খাবারের পসরা-খৈ, মুড়ি, বাতাসা, জিলাপি, নাড়ু, মোয়া, সন্দেশসহ নানা ঘরোয়া মিষ্টান্ন। অনেকেই এই খাবার কেনেন দূরদূরান্ত থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয়স্বজনের জন্য।
নারগিস বেগম, যিনি প্রতিবছর ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন, বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য খেলনা কিনেছি, আর বাড়ির সবার জন্য এই দেশি মিষ্টিগুলো। নববর্ষের আনন্দ এখানেই খুঁজে পাই।’
আর শিশুদের জন্য থাকছে নাগরদোলা, বেলুন, বাঁশির দোকান-সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
চুনারুঘাটের এই মেলার কোনো লিখিত ইতিহাস নেই, নেই সরকারি তত্ত্বাবধানও। তবুও মানুষের মুখে মুখে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে এ মেলা। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে এক গভীর শিকড়ের সন্ধান।
/মাহফুজ/