ফেনীর সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলায় ছোট ফেনী নদীর দুই তীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বছরের বন্যায় পানির তোড়ে সোনাগাজী উপজেলার মুসাপুর রেগুলেটরটি ভেঙে যায়। এরপর থেকে ছোট ফেনী নদীর দুই তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও সড়ক ভেঙে যাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের দিন কাটছে ভাঙন আতঙ্কে। যদিও ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে ছোট ফেনী নদীর ভাঙন রোধে সোনাগাজীর কাজিরহাটে একটি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০০২ সালে রেগুলেটরটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ২০০৬ সালের ৮ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কাজিরহাট রেগুলেটরের ২০ কিলোমিটার ভাটিতে ছোট ফেনী নদী নিষ্কাশন প্রকল্পের অধীনে মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় ২০০৯ সালে শেষ করা হয় ২৩ ভেন্টের মুছাপুর রেগুলেটরের কাজ। ১ দশমিক ৩০ লাখ হেক্টর জমি রক্ষার্থে এ প্রকল্প নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা। তবে ২০২৩ সালের এক তথ্য অনুযায়ী, (রেগুলেটরের বিভিন্ন সময়ে বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী) এই কাজে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এই রেগুলেটরের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৭৫৩ দশমিক ১৫ ঘনমিটার। রেগুলেটর নির্মাণের সময় নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট বন্যার পানির তোড়ে মুসাপুর রেগুলেটরি নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোনাগাজী উপজেলার চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চরবদরপুর, কুঠির হাট, কাটাখিলা, কালীমন্দির, বগাদানা ইউনিয়নের আলমপুর, আউরারখিল, চরদরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদরবেশ, আদর্শগ্রাম, পশ্চিম চরদরবেশ, তেল্লার ঘাট, ইতালি মার্কেট, ধনী পাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সড়ক, পুল, কালভার্ট, কয়েকশ ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিদিন লোকালয়ে এবং ফসলি জমিতে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খবর কেউ রাখে না। স্থায়ী সমাধান না করে, বারবার প্রকল্প করে সরকারি বরাদ্দ লোপাট করার অভিযোগ রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা বলছেন, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে মুসাপুর রেগুলেটরি দ্রুত পুনঃনির্মাণ করতে হবে।
কাজিরহাট জেলেপাড়ার বাসিন্দা রেখা রানী দাস বলেন, ‘রান্না ঘর, থাকার ঘর সব জোয়ারের পানি নিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে ছেলে-মেয়ে নিয়ে দিন পার করছি।’ সরকারসহ বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
কাটাখিল গ্রামের জাফর আহাম্মদ বলেন, ‘ভাঙতে ভাঙতে নদী বেড়িবাঁধের ১০ ফিটের কাছাকাছি চলে এসেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে ৫ নম্বর ইউনিয়ন, ২ নম্বর ইউনিয়ন, কেরামতিয়া বাজার ও কাজির হাটের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোনো মসজিদ নদী ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। তাই অবিলম্বে বেড়িবাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
আলমপুর গ্রামের মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘নদীর পাড়ে আমার তিন ভাইয়ের ঘর ছিল। তিনটাই নদীতে চলে গেছে। ধার-কর্জ করে কিস্তির টাকা নিয়ে একটি ঘর বানিয়েছিলাম। সেটিও নদীতে চলে যাচ্ছে। এখন কীভাবে থাকব? কার কাছে যাব? কে আমাকে আশ্রয় দেবে? দুশ্চিন্তায় ঘুম আসে না।’
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফাতিমা সুলতানা জানান, নদী ভাঙনের বিষয়ে জেলা প্রশাসন অবগত আছে। উপজেলা প্রশাসন ভাঙন তীরবর্তী এলাকার ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার ভাটার কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি প্রজেক্টের আওতায় ১৩ কিলোমিটার এলাকায় নদী সংরক্ষণের জন্য ১৫৫ কোটি টাকা সহায়তার প্রস্তাবনা রয়েছে; যা শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে নদী ভাঙন রোধ হবে।’