জীবিকার প্রয়োজনে এক দল নারী-পুরুষ নদীতে নেমে কেউ ডুব দিচ্ছেন, কেউ আবার মাথা উঁচু করে পানিতে দুই হাত দিয়ে কি যেন খুঁজছেন। দূর থেকে দেখে মনে হবে, তারা দল বেঁধে মাছ ধরছেন। আসলে তারা পানির নিচ থেকে ঝিনুক তুলছেন আর কোমরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা থলের মধ্যে রাখছেন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীর দুই তীরে এমন দৃশ্যের দেখা মেলে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জানা যায়, নদীতে ঝিনুক খুঁজছেন তারা। ঝিনুক কুড়িয়েই ভালো আয় হচ্ছে তাদের। তারা সবাই উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের (সূর্যপাড়া) আদিবাসী গ্রামের বাসিন্দা। আদিবাসী পাড়ার নারী-পুরুষরা দল বেঁধে শামুক আর ঝিনুক কুড়িয়ে থাকেন।
এ সময় ছোট যমুনা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কথা হয় এডওয়ার্ড কিসকু (৭০) নামে (ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সাঁওতাল) এক ব্যক্তির সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঝিনুক কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বাড়ির পাশে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রেখে দিই। এতে ঝিনুকগুলো এক সপ্তাহ পর্যন্ত তাজা থাকে। এর পর ঝিনুক ভেঙে ভেতরের নরম অংশটুকু রান্না করে খাওয়া হয়। ঝিনুকের খোলস ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। এতে আমাদের খাবারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং বেশ আয়ও হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৭০-৮০ কেজি ঝিনুক পাই।’
এতে বসে নেই ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী নারীরাও। তারাও খাবারের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য ছোট যমুনা নদী থেকে ঝিনুক তুলছেন।
খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের ক্রিসটিনা টুডু নামে এক নারী বলেন, ‘নদী থেকে এলাকার সবাই মিলে ঝিনুক তুলছি। ঝিনুক থেকে খাবার পাচ্ছি এবং খোলসগুলো ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছি। এতে ভালো আয় হচ্ছে।’
একই কথা বলেন মিলতি স্বরেন, লিনা হেমরম ও শান্তি মুরমু। তারা বলেন, বছরে তিন মাস নদীতে পানি কম থাকে। এ সময় ঝিনুক তুলতে সুবিধা হয়। তবে এখন বর্ষায় ঝিনুক তুলতে কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল পর্যন্ত ঝিনুক তুলে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিরামপুর ও সদর উপজেলার কয়েকজন ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে শামুক ও ঝিনুক কিনে আসছেন। এসব শামুক-ঝিনুক সেখানে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে অনেক পরিবার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, তারা ঝিনুক ৩৫০ টাকা মণ কিনছেন। এটা দিয়ে চুন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন। তবে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা সদরের চুনিয়াপাড়ার চুন তৈরির কারিগর মোহন চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের গ্রামের ১৫টি পরিবার রয়েছে, যারা ঝিনুকের চুন তৈরি করে। আমরা প্রতিদিন ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের কাছ থেকে পাইকারি দরে ঝিনুকের খোলস কিনি। পরে চুলার মধ্যে ঝিনুকের খোলস পুড়িয়ে ছাই তৈরি করি। এর পর বিশেষ প্রদ্ধতি অনুসরণ করে চুন তৈরি করা হয়। সেই চুন পাইকারি দরে হাট-বাজারে বিক্রি করি।’
ফুলবাড়ী উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা বেগম বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শামুক-ঝিনুক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এগুলো যেসব জলাশয়ে থাকে, সেখানে ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পানি দূষণমুক্ত রাখতে সহায়তা করে। এ জন্য এদের প্রকৃতির ফিল্টার বলা হয়। বন্যপ্রাণী নিধন আইনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে শামুক-ঝিনুক আহরণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অবৈধভাবে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসা করলে কিংবা প্রাকৃতিক উৎস থেকে এগুলো আহরণ করলে আইন অনুযায়ী এর শাস্তির বিধান রয়েছে।’