কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকায় আগাম বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ধান, বাদাম, ভুট্টা ও সবজির মাঠ। নষ্ট হচ্ছে ফসল। ভোগান্তিতে পড়েছেন শত শত কৃষক। অনেকে ভেজা ধান ঘরে তুলেও শুকাতে পারছেন না। চারা গজাচ্ছে ধানে। বাদামের খেত পানির নিচে। বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগ ও আবহাওয়া অফিস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সময়ের আগেই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। আরও বৃষ্টি হতে পারে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় ১২১ হেক্টর বোরো আবাদ, ৭৫ হেক্টর বাদাম, ৪১ হেক্টর পাট এবং ৪৯ হেক্টর সবজির আবাদ ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে ৭৫ হেক্টর বাদাম খেত।
গত দুই দিন বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন কৃষকরা। তবে ক্ষতির শঙ্কা এখনো রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আগাম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। তারা জানান, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিকে বৃষ্টি শুরু হয়। কিন্তু এবার মে মাসের শুরুতেই টানা বৃষ্টিতে তিস্তাপাড়ের অনেক এলাকায় কৃষকদের চরম দুর্ভোগ দেখা গেছে। অনেকে কলাগাছের ভেলা বানিয়ে পানির নিচে ধান কেটেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় শুকাতে পারছেন না। এতে ধান ঘরে তোলার পরও নষ্ট হচ্ছে। বাদাম, পাট, তিল, মরিচসহ বিভিন্ন সবজির খেত পানিতে ডুবে গেছে। ভুট্টা নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন অনেক কৃষক।
রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দ গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর ঠিকঠাক বাদাম তুলি। কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এবার তাড়াতাড়ি বৃষ্টি হইছে। বাদাম তোলার আগেই তলিয়ে গেল। ছয় একর বাদামের কিছু তুলেছি। কিন্তু শুকাব কীভাবে বুঝতেছি না।’ পাশের গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দুই একর ভুট্টা পানির নিচ থেকে তুললাম। বাদামও হয় নাই। খরচ উঠব না। জানলে বাদাম লাগাইতাম না।’
কৃষক হোসেন আলী বলেন, ‘বাদাম চাষের দেনার টাকা মানুষে পায়। বাদামও পাই না। টাকা শোধ করুম কেমনে বুঝতেছি না।’ রোদ না থাকায় অনেকেই কাটা ধান শুকাতে পারছেন না। ভেজা ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে। সদর উপজেলার তালুককালুয়া গ্রামের একরামুল হক বলেন, ‘ছয় বিঘা জমির ধান কেটেছি। মাড়াই করতে পারি নাই। নষ্ট হইতেছে।’ নাগেশ্বরীর কালিগঞ্জ এলাকার কৃষক ইমন বলেন, ‘৬০ মণ ধান ঘরে গাজাচ্ছে। আজ একটু রোদ পাইছি। কিন্তু তার আগে ধান নষ্ট হইয়া গেছে। পরে শুকাইলেও চালের ক্ষতি হইছে।’ তবে কিছু কৃষক চেষ্টা করছেন ঘরের ধান বাঁচাতে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভেজা ধান ঘনঘন উল্টে দিতে হয়। বিদ্যুৎ থাকলে ফ্যান চালিয়ে বাতাস দিলেও উপকার হয়।’
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুরন্নাহার সাথী বলেন, ‘অনেক কৃষক পরামর্শ মতো বাদাম তুলে নিয়েছেন। এতে কিছুটা ক্ষতি কম হবে।’ কুড়িগ্রাম কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘বৃষ্টি কিছুটা কমলেও সামনে আবারও বৃষ্টি হতে পারে। বর্ষার সময় চলে আসছে। এবার একটু আগেভাগে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এ অঞ্চলের কৃষকরা জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে বৃষ্টির হিসাব করে চাষ করেন। এবার আগেভাগে বৃষ্টি আসায় কিছুটা ক্ষতি হইছে। সেপ্টেম্বর থেকে একটানা খরা চলছিল। তাই এখন হঠাৎ করে পানি বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৯০ শতাংশের বেশি ধান কাটা শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময় ওই জমিতে কম জীবনকাল জাতের ধান বা আগাম ধান লাগালে কৃষক উপকৃত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির সময় পরিবর্তন হচ্ছে। এ জন্য কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।’ তিনি জানান, ঘরের ধান বেশি পরিচর্যা করলে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। পরিপক্ব বাদাম আগাম তুললেও তেমন ক্ষতি হয় না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, জেলার ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও গঙ্গাধর নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কিছু এলাকায় নদীভাঙন বেড়েছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাফিকুল হাসান বলেন, ‘কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে বন্যার আশঙ্কা এখনো নেই। কোথাও কোথাও ভাঙন বেড়েছে।’