টানা বর্ষণে ফেনীসহ দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এইচএসসি ও অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসন।
শুক্রবার (১১ জুলাই) ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় পানি নামতে থাকায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন মানুষ। তবে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম। বন্যার পানিতে মাছ ধরতে পাতানো কারেন্ট জাল তুলতে গিয়ে ফুলগাজীতে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া টানা বর্ষণে সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডসহ সদর, তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাগেরহাটে তলিয়ে গেছে ৯ শতাধিক মৎস্যঘের। এতে অর্ধকোটি টাকার মাছ ভেসে গিয়ে চাষিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের দুই-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অফিস বলেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য কোনো সতর্কবার্তা নেই এবং কোনো সংকেত দেখাতে হবে না। সমুদ্রবন্দরগুলো, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর
ফেনী: ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজানের পানিতে বন্যার কবলে পড়েছে ফেনীর পাঁচটি উপজেলা। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১টি স্থান ভেঙে প্লাবিত হয়েছে একের পর এক জনপদ। ১১৪ গ্রামের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ।
জানা গেছে, বন্যার পানিতে মাছ ধরতে পাতানো কারেন্ট জাল তুলতে গিয়ে ফেনীর ফুলগাজীতে নুরুল আলম (৬২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজ শেষে নিজ বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে পাতানো কারেন্ট জাল তুলতে যান নুরুল আলম। এ সময় তার পা জালে আটকে যায়। সেখানেই ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়।
মোটবী ইউনিয়নের ইজ্জতপুর উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৬টি পরিবারের ৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। ফুলগাজী-পরশুরামের কিছু কিছু এলাকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। গতকাল ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, যেসব স্থান দিয়ে পানির স্রোত গেছে সেসব স্থানে সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে করে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।
ফুলগাজী ও পরশুরামের পানি নামতে থাকায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন মানুষ। তবে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম। পানিতে তলিয়ে গেছে মানুষের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, ফসলি জমি। ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ। স্থানীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের বন্যার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার আবার বন্যার কবলে পড়ে তারা নিঃস্ব হয়েছেন। চারদিকে থই থই পানি, অন্যের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেও পোকামাকড় আর সাপের উপদ্রবে আতঙ্কে দিন পার করছেন বানভাসিরা।
ফেনী সদর উপজেলার মোটবীর ইজ্জতপুর এলাকার বাসিন্দা রাশেদা আক্তার বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করে। এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছি। প্রশাসনের লোকজন খাবারের জন্য জিনিসপত্র দিয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ফেনীর বন্যাকবলিত পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া (আংশিক), ফেনী সদর (আংশিক) ও দাগনভূঞা (আংশিক) উপজেলার ১১৪টি গ্রামের জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সব অংশীজনের সহযোগিতায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে ঘোষিত আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৯ হাজার ২০০ মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় দুর্যোগে সবচেয়ে নাজুক।
গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ ১৮ জনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয়েছে।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘জেলায় টানা চার দিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। তবে আজ (শুক্রবার) সূর্যের দেখা মিলেছে। সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’
ফেনীর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তায় বন্যাকবলিত কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরা: টানা বর্ষণে সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডসহ সদর, তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দুর্ভোগে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। জলাবদ্ধতায় শহর ও আশপাশের এলাকার শতাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পানিতে তলিয়ে আছে। বিশেষ করে এইচএসসি ও অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার সময় বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ যেন এক জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কলেজে প্রবেশ করতেই কাদামাটি ও পচা পানির দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরতে হয়। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা বলেন, ‘প্রতিদিন ভেজা জামা-কাপড়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, মনে হয় নদী পার হচ্ছি।’ পাটকেলঘাটা আমিরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কালীগঞ্জের মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস স্কুল, বদ্দিপুর প্রাইমারি স্কুলসহ বহু প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই ভেলা, বাঁশ বা জুতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিস, ব্যারাক, অস্ত্রাগার ও রেশন স্টোরেও পানি জমে গেছে।
টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান ও বিভিন্ন সবজিখেত। ভেসে গেছে অসংখ্য মৎস্যঘের। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মনির হোসেন জানান, আমন বীজতলা, বরবটি, শিম, শসা ইত্যাদি সবজিখেত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি সরে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
বাগেরহাট: বাগেরহাটে ভারী বর্ষণে নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। বিশেষ করে তলিয়ে গেছে ৯ শতাধিক মৎস্যঘের। এতে অর্ধকোটি টাকার মাছ ভেসে গিয়ে চাষিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গলদা চিংড়ি উৎপাদনের অন্যতম এলাকা জেলা সদর, মোংলা, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, ফকিরহাট, চিতলমারী ও মোল্লাহাটের চাষিদের। মৎস্যচাষিরা জানান, হঠাৎ করেই পানি বাড়তে শুরু করে। মাত্র এক রাতেই ঘেরগুলো ডুবে যায়। মাছ বের করে নেওয়ার কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
গোপালগঞ্জ: টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে গোপালগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায়। পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের পোদ্দারের চর, নিলার মাঠ ও গোবরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার অধিকাংশ ঘরেই ঢুকে পড়েছে পানি। শতাধিক পরিবার এখন পানিবন্দি। এমন পরিস্থিতি শহরের মডেল স্কুল রোড, বটতলা মোড়, হীরাবাড়ি রোড, বাজার রোড, ডিসি রোডেও।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি। তলিয়ে যাওয়া ফসল রক্ষা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হান্নান মোল্লা বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েছেন ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। কোমরপানি ভেঙে স্কুলে যাওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় ক্ষতি হয়েছে মালামালের। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’
গোপালগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলেছেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’