ফেনীতে চলমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে বন্যা রক্ষা বাঁধের ২১টি স্থানে ভাঙনে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) থেকে বৃষ্টিপাত কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়। পানি নেমে যাওয়ার পর রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন খামারে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। ওই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র পুকুর ভেসে যাওয়া ও বিভিন্ন মাছের খামারীদের ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। এর বাইরে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রতিবেদনে মুরগি, গরু, ছাগল ও মহিষ মারা গিয়ে ৬৪ লাখ টাকার সম্পদহানির কথা বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিভাগ—বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট—এর ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। পানি গড়িয়ে যাওয়ার পর গ্রামীণ বহু সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে সহায়তার অপেক্ষায় আছেন।
জানা যায়, গত ৭ জুলাই বিকাল থেকে ফেনীতে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর মাঝে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মঙ্গলবার রাতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একাধিক স্থান ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়। সর্বশেষ ফুলগাজী ও পরশুরাম এলাকায় বাঁধের ২১টি স্থান ভেঙে প্রায় ৪ উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। এসব এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, আসবাবপত্র, গবাদি পশুসহ সবকিছু বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক কাপড়ে মানুষ জেলার অর্ধশতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়।
বন্যার পানিতে শেষ হয়ে যায় কৃষকের মুরগীর খামার। ছবি: খবরের কাগজ
প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ মানবিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় ফুলগাজী ও পরশুরামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়। তবে লোকালয়ে ঢুকে পড়া পানি গড়িয়ে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নতুন করে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। শনিবার (১২ জুলাই) এ প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত ফুলগাজী ও পরশুরামের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও ফেনী সদর ও ছাগলনাইয়ার অনেক মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, অতিবৃষ্টিপাত ও বাঁধভাঙা পানিতে জেলার সব উপজেলা আক্রান্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ২ হাজার ৩৩০টি পুকুর ডুবে গেছে, এতে প্রায় ৮ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার মাছ ও ২ কোটি ৮১ লাখ টাকার মাছের পোনা ভেসে গেছে। প্রায় অর্ধ কোটি টাকার অবকাঠামো ক্ষতিরও তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেসে যাওয়া পুকুরের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক জানান, বন্যায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকার ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ৪টি গরু, ৩টি ছাগল, ১টি ভেড়া, সাড়ে ১০ হাজার বাণিজ্যিক মুরগি এবং ২৩৫টি হাঁস মারা গেছে। এছাড়া অন্তত ২০ হাজার গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, এটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নয়, দিন দিন এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে বলা হয়, চলমান বন্যায় ৮৪৫ হেক্টর আউশ ধান, ৫৩৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি, ১৪ হেক্টর মরিচ, ৭ হেক্টর আদা, আড়াই হেক্টর হলুদ, ১১ একর টমেটো, ৬৮৯ হেক্টর বীজতলা ও ৩৪৭০ হেক্টর বস্তায় রাখা আদা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ এখনো ক্ষয়ক্ষতির টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করেনি। পানি নেমে গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ।
ফেনী জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বন্যা এখনো শেষ হয়নি। কয়েকটি বিভাগ প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়েছে, তবে এটিকে চূড়ান্ত ধরা যাচ্ছে না। এখনও অনেক এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। পানি নেমে যাওয়ার পরই চূড়ান্ত তথ্য হাতে পাওয়া যাবে। দুর্গত এলাকায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।