তিস্তা নদীতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পানি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বুধবারও (৩০ জুলাই) তিস্তার এমন চিত্র লক্ষ করা গেছে। পানি বাড়ার ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় জেলার তিস্তা পাড়ের গ্রামগুলো আবারও ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙনের তীব্রতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মানুষ। এরই মধ্যে অনেকের বাড়িঘর, জমিজমা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ভাটি এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ রয়েছে সেখানের শিক্ষা কার্যক্রম।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর
নীলফামারী: গতকাল ডিমলা উপজেলার তিস্তা পাড়ের কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বাঁধে ভাঙন রয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় তলিয়ে গেছে বাড়িঘর। আবার কোথাও ভাঙন বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, ‘ভাঙন ঠেকানো না গেলে এবার আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব, আমাদের ঠাঁই হবে রাস্তায়।’
ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব দুহলপাড়া গ্রামের আশিনুর আঁখি বলেন, ‘আমার শ্বশুরের ১১ বিঘা জমি ছিল। সেই জমি এক এক করে সব তিস্তায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন বসতভিটাও বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
পূর্ব দুহলপাড়ার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘আর দুহাত ভাঙলেই একমাত্র আশ্রয়স্থল বাড়িটি চলে যাবে নদীগর্ভে। এক সপ্তাহ আগে ছাগলের খামারটি নদীগর্ভে চলে গেছে।’
দক্ষিণ খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার বজলার রহমান জানান, ইতোমধ্যে বেশ কিছু বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইউনিয়নের ৫টি গ্রামের আবাদিজমি ও বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে মানুষ।
লালমনিরহাট: গতকাল তিস্তায় হঠাৎ উজানের পানির চাপ বাড়ায় ব্যারাজ পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করে পানি। এতে বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে। পানির চাপে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ধুবনী এবং উত্তর ও পূর্ব ডাউয়াবাড়ি এলাকায় রাস্তা ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবশেষ তিস্তার ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে পানি কমলেও ভাটি অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় জেলার পাঁচ উপজেলার অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে এসব এলাকার বাসিন্দারা। বাড়িঘরে পানি থাকায় বন্ধ রয়েছে রান্না, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। ডুবে গেছে নিম্নাঞ্চলের কাঁচা-পাকা সড়ক ও মৌসুমী ফসলের খেত। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয়ে পানি থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বন্ধ ছিল শিক্ষা কার্যক্রম।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, ‘তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। নদী তীরবর্তী ধুবনি এলাকায় একটি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। সকালে পানি কিছুটা কমেছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টা পানির স্তর স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং এরপর তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ প্লাবিত এলাকায় জেলা প্রশাসন থেকে চাউলসহ প্রয়োজনীয় বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নিয়ন্ত্রণকক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীর পানি বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে ৫২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখঘাট ২১ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত এই পরিমাণ পানি বেড়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নে তিস্তা নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ফসলি জমি, ফলের বাগান, সড়কসহ প্রায় অর্ধশতাধিক বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার বাড়িঘর ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
পাউবোর গাইবান্ধা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, ‘ভাঙন এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে।’
বগুড়া: বাঙ্গালী নদীর ভাঙনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় কাটাখালী এলাকার বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমপক্ষে ৫০টি পরিবারের বাড়িঘর। হুমকির মুখে পড়েছে জয়লা বাজার থেকে চকধলী পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা।
শেরপুর উপজেলার চককল্যাণ গ্রামের বাসিন্দা মো. হোসেন আলীর অভিযোগ, ১৯৯২ সালে কাটাখালিতে বালিমাটি দিয়ে নির্মিত বাঁধটি গত ৩৩ বছরে একবারও মেরামত করা হয়নি। ফলে দুর্বল হয়ে পড়া বাঁধটি পানির চাপে কয়েক দিন আগে বিলীন হয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক মানুষ। ভেসে যায় অনেক পুকুরের মাছ।